১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৮

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণে স্পেনে দিন-রাতের আবহ, মুগ্ধ লাখো দর্শক

স্পেনে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ  © সংগৃহীত

স্পেনের উত্তরাঞ্চলজুড়ে বুধবার সন্ধ্যায় বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখেছেন লাখো মানুষ। চাঁদ পুরোপুরি সূর্যকে ঢেকে ফেলায় দিনের আলো মুহূর্তেই গোধূলির মতো হয়ে যায়। কিছু সময়ের জন্য চারপাশ প্রায় অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে আলো ফিরে আসার দৃশ্যও মুগ্ধ করে দর্শকদের। সূর্যগ্রহণ দেখতে উত্তর স্পেন ও বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৬০ লাখ মানুষ জড়ো হন।

সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে স্পেনজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে বিশেষ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে দাবানলের ঝুঁকি থাকায় বাড়ানো হয় নজরদারি। বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হয় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি প্রায় ১০০টি বিমান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়।

মাদ্রিদের উত্তরের গ্রামীণ এলাকা বুইত্রাগো দে লোসোয়ায় সূর্যগ্রহণ দেখতে জড়ো হওয়া দর্শকেরা আকাশ অন্ধকার হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে করতালি ও উল্লাসে মেতে ওঠেন। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার কিছু পর পূর্ণগ্রাসের পর্যায়ে পৌঁছায় গ্রহণ। তখন চাঁদের চারপাশে সূর্যের আলোর উজ্জ্বল বিন্দু দেখা যায়। তবে পূর্ণগ্রাসের এই দৃশ্য এক মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয়।

৩২ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ দিয়েগো ফের্নান্দেস বলেন, ‘পূর্ণগ্রাসের পর ধীরে ধীরে যখন রংগুলো ফিরে আসে, প্রথমে লাল, এরপর নীল—তখন মনে হয় ঠিক ভোর বা সূর্যাস্তের মতো। এটা পুরোপুরি আপনার মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে।’

মাদ্রিদের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী রাফায়েল হিমেনেসের কাছেও পুরো ঘটনাটি ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, ‘এটা ছিল একেবারেই অবাস্তব একটি দৃশ্য; এমনকি বাগানের পানির স্প্রিংকলার চালু হয়ে যাওয়ায় আমরা ভিজেও গিয়েছিলাম। আর এরপর হঠাৎ করেই আমরা আবার সূর্যাস্ত দেখছিলাম।’

স্পেনের আগে আইসল্যান্ডের আকাশেও সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। তবে দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় দৃশ্যটি স্পেনের তুলনায় কম স্পষ্ট ছিল। অবশ্য আইসল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলে মেঘের ফাঁক দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পান। রাজধানী রেইকিয়াভিকে মেঘের কারণে পূর্ণগ্রাস সরাসরি দেখা না গেলেও চারপাশের অন্ধকার থেকে গ্রহণের প্রভাব স্পষ্ট বোঝা যায়।

আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে ৩৩ বছর বয়সী আইনজীবী এদুয়ার্দা অর্তিজ বলেন, ‘মনে হচ্ছিল পুরো একটি দিন যেন একসঙ্গে এসে গেছে। আমার শরীরে কাঁটা দিচ্ছিল, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল—জীবন কতটা সংক্ষিপ্ত, সময় কতটা ভিন্ন হতে পারে এবং বিষয়টি আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও নির্ভর করে।’

২৭ বছর পর পশ্চিম ইউরোপের আকাশে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে আইসল্যান্ড ও উত্তর স্পেনে লাখো মানুষ জড়ো হন। এই দর্শকদের মধ্যে ছিলেন রক ব্যান্ড কুইনের সাবেক গিটারিস্ট ব্রায়ান মে-ও। তিনি স্পেনের তেরুয়েল প্রদেশের একটি মানমন্দিরে গিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখেন। পরে নিজের ইনস্টাগ্রাম পেজে সেই অভিজ্ঞতার বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরেন।

গ্রহণ যখন পূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ব্রায়ান মে বলেন, ‘এই তো শুরু হলো। সূর্য অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এটা অসাধারণ।’ এরপর উপস্থিত দর্শকেরা কাউন্টডাউনের পর উল্লাস ও করতালিতে ফেটে পড়েন।

স্পেনে সূর্যগ্রহণ দেখতে উত্তরাঞ্চল ও বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৬০ লাখ দর্শনার্থী আসবেন বলে আশা করেছিল কর্তৃপক্ষ। এসব এলাকার বেশির ভাগই ছিল গ্রামীণ অঞ্চল। এবারের আয়োজনের মাধ্যমে দেশটির তুলনামূলক কম ভ্রমণ করা অঞ্চলগুলোকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ থাকা সমুদ্রসৈকত থেকে দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করার সুযোগ পেয়েছে স্পেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কেউ কেউ এই বিশেষ দিনকে বিয়ের জন্যও বেছে নেন।

আইবেরীয় উপদ্বীপে এর আগে সর্বশেষ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল ১৯১২ সালে। তবে আগামী ২ আগস্ট ২০২৭ আবারও এই অঞ্চলে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এরপর ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে দেখা যাবে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে শেষ হবে কথিত ‘আইবেরিয়ান গ্রহণ ত্রয়ী’।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় দিনের আলো হঠাৎ গোধূলির মতো হয়ে যায়। চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে সরাসরি অবস্থান করে, তখন সূর্যের আলো ঢেকে যায় এবং কিছু প্রাণীও নীরব হয়ে পড়ে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এমন ঘটনাকে মহাজাগতিক সংঘাতের ইঙ্গিত বা ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।

তবে এবারের সূর্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে স্পেনে দাবানলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের মধ্যে। বুধবারও দেশটির বিভিন্ন এলাকায় জরুরি কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছেন। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের আন্দালুসিয়ায় একটি বড় দাবানলও ছিল।

সূর্যগ্রহণ দেখতে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের কারণে নতুন করে দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের পুলিশি অভিযান ও জননিরাপত্তা প্রচার চালায়।

ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলের পেনিসকোলা শহরের একটি সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের কাছে ছোট একটি আগুনও লাগে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি গাড়িতে আগুন লাগার পর তা আরও ৩৩টি গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ঘটনাস্থলে বিমানসহ জরুরি উদ্ধারকারী দলও পাঠানো হয়।

বুধবার রাত পর্যন্ত সূর্যগ্রহণ দেখতে আসা দর্শনার্থীদের কারণে কোনো দাবানল সৃষ্টি হয়েছে—এমন কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, ‘উপন্যাসের দেশ’ হিসেবে পরিচিত আইসল্যান্ডেও সূর্যগ্রহণ ঘিরে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যায়। দেশটিতে সূর্যগ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা কয়েক দিন আগেই শেষ হয়ে যায়। প্রায় ৪ লাখ মানুষের দেশটিতে এবারের সূর্যগ্রহণ দেখতে প্রায় ৮০ হাজার পর্যটক আসেন বলে ধারণা করা হয়।

আইসল্যান্ডের সবচেয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৪ মিনিটের দিকে পূর্ণগ্রাস শুরু হয়। সেখানে সর্বোচ্চ ২ মিনিট ১৩ সেকেন্ড পর্যন্ত পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়।

এই সূর্যগ্রহণ দেখতে সাধারণ দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ‘গ্রহণ শিকারি’দেরও দেখা যায়। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান শুধু পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য। যেখানেই পূর্ণগ্রাসের সম্ভাবনা থাকে, সেখানেই ছুটে যান তারা।

স্পেনের বুইত্রাগো দে লোসোয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় ৪৩ বছর বয়সী গেমা নিজের শেষ নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সবাই আপনাকে এ সম্পর্কে বলে, কিন্তু বাস্তবে এটি আপনার কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দর।’