হরমুজ প্রণালি ‘১০০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণের’ দাবি ট্রাম্পের, ইরানের কাছে চাইলেন ক্ষতিপূরণ
হরমুজ প্রণালি নিজেদের ‘১০০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে যুদ্ধের হতাহতদের পরিবার এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন তিনি। ইরানও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করার কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্পের পাল্টা এই দাবি সামনে এলো। তেহরান জানিয়েছে, ক্ষতিপূরণসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এর আগে ইরান জানিয়েছিল, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্ন নেই।
ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে এখন কেবল ‘আংশিকভাবে আলোচনা’ করছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো হতে পারে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়ে উঠছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা রোববার রাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন মোচা বন্দর শহরে হামলা চালিয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শহরটিতে এটি ছিল দ্বিতীয় হামলা। ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেন। শিশুদের টিকার সুপারিশ নিয়ে একটি নির্বাহী আদেশে সই করার পর ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা প্রণালিটি ১০০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করি। এখন তারা কি সমস্যা তৈরি করতে পারে? হ্যাঁ, তারা সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু তারা দেউলিয়া, তাদের কোনো টাকা নেই।’
ইরানের দিকে যাওয়া জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধকে ট্রাম্প ‘ইস্পাতের দেয়াল’ এবং ‘অভ্রান্ত’ বলে উল্লেখ করেন। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘কিছুটা জটিল’ বলেও বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘তারা মাঝে মাঝে মাইন ফেলবে, আর আমরা সেই মাইনগুলো খুঁজে বের করি।’
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মধ্যেই ইরানের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে তেহরান। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়ে ইরান বলেছে, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা সম্মত হবে না।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় এর ওপর চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রণালিটি দিয়ে চলাচল ব্যাহত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি কেবল দুই দেশের মধ্যকার বিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, সম্প্রতি সাত ঘণ্টার এক বৈঠকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন।
ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা না গেলেও পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চললেও প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে সেই জল্পনার কিছুটা অবসান ঘটানোর চেষ্টা দেখা গেছে।
খামেনির কার্যালয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে নতুন নিয়োগের ঘোষণাও দিয়েছে। এর মধ্যে সাবেক এক যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান করা হয়েছে।
একদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থান, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ—সব মিলিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তেহরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন মোড় নিচ্ছে।
তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের ‘১০০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণের’ দাবি এবং ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবির মধ্যে সমঝোতার কোনো স্পষ্ট পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুনরায় চালু করার প্রশ্নটি শুধু সামরিক বা নৌনিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে এখন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ও জড়িয়ে গেছে।