গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাড়ছে উত্তেজনা
গাজা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। নেতানিয়াহুর এমন অবস্থানে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত কমানোর প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ইসরায়েলের মতবিরোধ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল ১৫ দফার নথিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।’ গত মাসে হামাস এই পরিকল্পনাটিতে সম্মতি জানিয়েছিল।
নেতানিয়াহু বলেন, হামাস সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না। তাঁর ভাষায়, ‘ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হামাসকে সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না এবং আমাদের সেনা ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলা করে যাবে।’
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমেরিকানদের সঙ্গে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি। তাদের কিছু ধারণা আছে, যার কিছু আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। এসব বিষয়ে কীভাবে দৃঢ় অবস্থান নিতে হয়, তা আমরা জানি।’
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াইট হাউসের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রবিবার পরে টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, তারা পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।
ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীটি মধ্যস্থতাকারী ও পরিকল্পনার নিশ্চয়তাদানকারী দেশগুলোর প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে এমন কোনো ‘লঙ্ঘন বা চুক্তিভঙ্গ’ ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
গত বছরের অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজাজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
৩০ জুলাই ট্রাম্প একটি ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তির ঘোষণা দেন। এতে গাজায় হামাস ও অন্যান্য সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের’ কথা বলা হয়। ট্রাম্প ওই চুক্তিকে ‘স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর মাধ্যমে হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হয়। এতে ইসরায়েল ও বেশ কয়েকটি আরব দেশসহ প্রায় ৪০টি দেশ রয়েছে। তবে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি এই বোর্ডে নেই। ট্রাম্পকে বোর্ডটির আজীবন চেয়ারম্যান করা হয়েছে।
রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমি যতদিন প্রধানমন্ত্রী আছি, ততদিন কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত এই পরিকল্পনা মেনে চলবে না।
নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল ‘বাস্তব নিরস্ত্রীকরণ, কোনো কাল্পনিক নিরস্ত্রীকরণ নয়’ চায়। এর অর্থ হলো হামাসের সব ধরনের অস্ত্র সরিয়ে ফেলা। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত ছোট অস্ত্রও থাকবে বলে জানান তিনি।
ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনায় শুরুতে হামাসের ভারী অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম তৈরির স্থাপনা, অস্ত্রের গুদাম এবং গাজার বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক প্যাটি কালহান বলেছেন, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে ‘খুবই বিপজ্জনক একটি খেলা’ খেলছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল ক্রমেই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টি ‘ফিলিস্তিনিদের পক্ষে খুব জোরালোভাবে ঝুঁকে পড়ছে’।
কালহান আরও বলেন, ট্রাম্প চাইলে ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সময় এসেছে’ বলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এমনটি হলে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্যও তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। এতদিন রিপাবলিকান পার্টিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ‘সবচেয়ে দৃঢ় মিত্র’।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ বলেন, নেতানিয়াহুর বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের সামনে চলমান সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ নিয়ে ‘গুরুতর প্রশ্ন’ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘এখানে পুরো পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার ফলে ধারাবাহিকতা ও পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।’
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেম থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নূর ওদেহ বলেন, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে নেতানিয়াহু যে শর্ত দিয়েছেন, তা ‘বোর্ড অব পিস’ এবং মধ্যস্থতাকারীদের জন্য ‘অত্যন্ত সমস্যাজনক’ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা কয়েক মাস ধরে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।
পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্ব একটি কারিগরি বা বিশেষজ্ঞভিত্তিক ফিলিস্তিনি কমিটির কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। এই কমিটি ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
তবে নূর ওদেহ বলেন, ইসরায়েলের সমর্থন ছাড়া বোর্ডটির সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ‘খুবই সীমিত’।
তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু আবার সবকিছু শূন্য থেকে শুরু করার অবস্থায় নিয়ে গেছেন।’
গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে নামমাত্র যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই বিশেষজ্ঞরা ইসরায়েল এই চুক্তি মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছেন। কারণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন।
রোববার ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, খান ইউনিসের আল-নাজ্জার এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে অন্তত এক শিশু আহত হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি তথাকথিত যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৫৮ জন নিহত এবং ৪ হাজার ১৩৯ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৮০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭৩ হাজার ৩৮৬ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ২৫০ জন।
এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতিস্থাপনকারীরা প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের আর তিন মাসেরও কম সময় বাকি। এর আগে নেতানিয়াহুর দল বসতিস্থাপনকারীদের ভোট নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে।
ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, ইসরায়েলি সেনারা নাবলুস গভর্নরেটের কয়েকটি গ্রাম এবং বেথলেহেমের পূর্বাঞ্চলের একাধিক শহরে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি ও তছনছ করেছে।
আল জাজিরার ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, তুবাস, আল-মুঘাইয়ির, মাসাফের ইয়াত্তা এবং ওয়াদি আল-রাখিম এলাকায় ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী ও সেনারা হামলা চালিয়েছে। এ সময় তারা কৃষিজমিও ধ্বংস করেছে।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণেও ইসরায়েলি পুলিশের সহযোগিতায় ইসরায়েলি উপাসনাকারীরা প্রবেশ করেছে।
ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ। মুসলমানদের বিশ্বাস, এখান থেকেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মিরাজে ঊর্ধ্বগমন করেছিলেন।
অন্যদিকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছেও স্থানটি অত্যন্ত পবিত্র। তারা এটিকে ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে অভিহিত করে। তাদের বিশ্বাস, প্রাচীন জেরুজালেমের মন্দিরটি একসময় এই স্থানেই ছিল।
সামরিক বাহিনীর সুরক্ষায় ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের একটি দল রামাল্লার পশ্চিমে বেইত উর আল-তাহতাহ শহরেও প্রবেশ করে। একই সময়ে আরেকটি দল রামাল্লার উত্তরে জালজুলিয়া গ্রামের উপকণ্ঠের আল-বাতিন এলাকায় প্রবেশ করে বলে ওয়াফা জানিয়েছে।
রামাল্লা ও আল-বিরেহ গভর্নরেটের বিভিন্ন এলাকাতেও ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা অভিযান চালিয়েছে।
বেথলেহেমের কাছে ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তিতেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। নাবলুসের পশ্চিমে দেইর শারাফ এলাকায় তারা জলপাইগাছ কেটে ফেলেছে এবং পানির ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
রামাল্লার উত্তর-পূর্বে আল-মুঘাইয়ির এলাকায় সামরিক বাহিনীর সুরক্ষায় ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপরও হামলা চালিয়েছে।
এদিকে জেনিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে আররাবেহ এলাকায় ‘এমেক দোতান’ নামে একটি নতুন অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি মন্ত্রী ও পার্লামেন্ট সদস্যরা অংশ নিয়েছেন।