কারাগারে ৩ বছর, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে উত্তাল পাকিস্তান
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাবন্দি জীবনের তিন বছর পূর্ণ করেছেন। এ উপলক্ষে তার মুক্তির দাবিতে বুধবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। একই সঙ্গে তার পরিবার, দল এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিনের একাকী কারাবাসের নিন্দা জানিয়ে তার সাংবিধানিক অধিকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে হাজারো পিটিআই নেতা-কর্মী ও সমর্থক বিক্ষোভে অংশ নেন। দলটির দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই ইমরান খানকে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রাখা হয়েছে।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সমর্থনে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সেই অভিযোগ অস্বীকার করে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু করেন ইমরান। ২০২৩ সালের মে মাসে তাকে প্রথম সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। পরে একই বছরের ৫ আগস্ট দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসসহ একাধিক অভিযোগে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। শুরু থেকেই তিনি এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
এরপর থেকে ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবি একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। একই সময়ে পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটিকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে একটি দুর্নীতির মামলায় ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন ইমরান খান। একই মামলায় তার স্ত্রী বুশরা বিবির সাত বছরের সাজা হয়েছে। এছাড়া গত ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় উপহার সংক্রান্ত আরেক মামলায় তাদের দুজনকে আরও ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পিটিআই লিখেছে, ‘তিন বছর। কারাগারের দেয়ালের আড়ালে হাজারো দিন। তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার অসংখ্য চেষ্টা। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে।’
দলটি আরও লিখেছে, ‘গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন এবং জনগণের নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকারের সংগ্রাম স্বেচ্ছাচারী আটকের মাধ্যমে কখনোই শেষ হয় না।’
মঙ্গলবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে ইমরান খান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। গত ডিসেম্বর থেকে তিনি আইনজীবীদের সঙ্গেও কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ইসাবেল লাসি বলেন, ‘তিন বছর ধরে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে ইমরান খানের ন্যায্য বিচারের অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করেছে, দীর্ঘ সময় একাকী বন্দি করে রেখেছে এবং চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার সীমিত করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো শর্ত ছাড়াই ইমরান খান ও বুশরা বিবির পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার অধিকার পুনর্বহাল করতে হবে।’
লাসি বলেন, ‘তাদের দুজনকেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে হবে এবং তাদের অবৈধ একাকী কারাবাস অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’
এছাড়া তিনি পিটিআইয়ের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে 'অবৈধ ও স্বেচ্ছাচারী দমন-পীড়ন' পুনরাবৃত্তি না করার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের দুটি পৃথক সংস্থাও ইমরান খানের কারাবাসের পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মত দিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন ইমরান খানের আটককে ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলে উল্লেখ করে। সংস্থাটি জানায়, তার বর্তমান বয়স বিবেচনায় এই কারাবাস কার্যত আজীবন সাজায় পরিণত হতে পারে।
গত ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস জানান, ইমরান খানকে প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত একাকী কক্ষে রাখা হচ্ছে এবং সার্বক্ষণিক ক্যামেরার নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের পরিবেশ নির্যাতনের শামিল হতে পারে।
তিনি বুশরা বিবির কারাকক্ষ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, কক্ষটিতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই এবং কারাগারে থাকার সময় বুশরা বিবির ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এদিকে, কারাবাসের চতুর্থ বছরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার ডান চোখের রেটিনায় সমস্যা ধরা পড়ে। এরপর সরকারি হাসপাতালে তাকে পাঁচটি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। তবে পিটিআইয়ের দাবি, পরিবারের সদস্য বা আইনজীবীদের আগাম না জানিয়েই এসব চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের একটি আবেদন শুনানির সিদ্ধান্ত নেয়। ওই আবেদনে তিনি ইসলামাবাদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর এবং নিজের পছন্দের চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি চেয়েছেন।
লাহোরভিত্তিক সাংবিধানিক আইনজীবী রিদা হোসেন বলেন, ‘যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাওয়া রাষ্ট্রের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি একটি সাংবিধানিক, আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইমরান খানের পরিবারের সদস্য ও দলীয় নেতাদের বারবার দেখা করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়ার দৃশ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ পাকিস্তানের স্বাধীন আদালতের এখতিয়ার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে অতিক্রম করতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিয়মিত বিচারিক তদারকির আওতায় ইমরান খানের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা, রান্নার সুবিধা, ব্যায়ামের ব্যবস্থা এবং সাধারণ বন্দিদের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।’
পিটিআই নেতা ও আইনজীবী আবুজর সালমান নিয়াজি বলেন, ‘একের পর এক মামলা, দীর্ঘদিন কারাবাস, আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে বাধা এবং আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার পথে অস্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতা—সব মিলিয়ে মনে হয়, এখানে স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে অন্য কোনো বিষয়ও কাজ করছে।’
তবে তালাল চৌধুরী এ অভিযোগও নাকচ করে বলেন, ‘কারাগারের পরিবেশ নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসে।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পলিট্যাক্টের বিশ্লেষক আরিফ আনসার বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতি ইমরান খানের মুক্তির সম্ভাবনা বাড়ায়নি, বরং কমিয়েছে। এতে বোঝা যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমঝোতায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে আরও কমে গেছে।'
তিনি মনে করেন, পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো যতদিন ইমরান খানকে বড় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখবে, ততদিন তার রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা নাকচ করেছে।
তালাল চৌধুরী বলেন, 'যেকোনো ধরনের স্বস্তি বা মুক্তি বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আসতে হবে, রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নয়। আইনের বাইরে কাউকে বিশেষ সুবিধা বা রাজনৈতিক সমঝোতা দেওয়া হবে না। জবাবদিহি নিয়ে কোনো দরকষাকষি হতে পারে না।'
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে মূলত সেনাবাহিনীর অবস্থানের পরিবর্তন।
তবে ইসলামাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাইগাম খান মনে করেন, 'ইমরান খানের মুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান।'
তার দাবি, ২০২৩ সালের ৯ মে সেনা স্থাপনায় হামলার ঘটনার জন্য সেনাবাহিনী ইমরান খানের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতার কোনো উদ্যোগও নেননি।
অন্যদিকে পিটিআই নেতা আবুজর সালমান নিয়াজি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি প্রকৃত স্বাধীন অঙ্গ হিসেবে কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছে।'