৪ দিন সাঁতরে সেউতায় পৌঁছে ক্ষুধা, ক্লান্তি ও বৈরিতার মুখে ফের মরক্কোয় ফিরলেন অভিবাসীরা
চার দিন সাঁতরে কিংবা সীমান্তের উঁচু বেড়া টপকে স্পেনের স্বশাসিত অঞ্চল সেউতায় পৌঁছেও নতুন জীবনের স্বপ্ন পূরণ হয়নি বহু অভিবাসীর। ক্ষুধা, ক্লান্তি, খাবারের সংকট এবং স্থানীয়দের বৈরী আচরণের মুখে পড়ে তাদের অনেকেই শনিবার আবার মরক্কোয় ফিরে গেছেন।
ফিরে আসা অভিবাসীরা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বন্ধুদের বার্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে তারা সীমান্ত পার হওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তবে সেউতায় পৌঁছে তারা বুঝতে পারেন, সেখান থেকে মূল ভূখণ্ড স্পেনে যাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও সেউতায় এখনো কয়েক হাজার অভিবাসী অবস্থান করছেন।
ফিরে আসা অভিবাসীরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং বন্ধুদের পাঠানো বার্তায় তারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। ওই ভিডিও ও বার্তাগুলোতে বলা হয়েছিল, কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা সীমান্ত এবার পার হওয়া সম্ভব।
কিন্তু সেউতায় পৌঁছে তারা দেখেন, সেখান থেকে মূল ভূখণ্ড স্পেনে যাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই।
মরক্কোর ফেজ শহরের একটি বেকারিতে কাজ করা ব্রাহিম বলেন, চাকরি ছেড়ে তিনি হাজারো মানুষের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্য দেখে তার মনে হয়েছিল, ইউরোপে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারবেন।
তিনি বলেন, 'আমরা উন্নত জীবনের আশায় এসেছিলাম, প্রতারিত হতে নয়। আমি ভেবেছিলাম সেখানে গিয়ে ভালো ভবিষ্যৎ গড়ব। কিন্তু সেউতায় গিয়ে আমি হতবাক হয়ে যাই।'
ব্রাহিম জানান, টানা তিন দিন তিনি শুধু পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন। স্পেনের অংশে খাবারের দাম এত বেশি ছিল যে, তা কেনার সামর্থ্য তার ছিল না।
তার ভাষায়, 'একটা টুনা মাছের স্যান্ডউইচের দাম ১০০ দিরহাম (প্রায় ১০ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলার) কীভাবে হতে পারে?'
সেউতার বিপরীতে মরক্কোর সীমান্ত শহর ফনিদেকে শনিবার প্রায় ফাঁকা রাস্তা দেখা গেছে। অথচ বৃহস্পতিবার একই এলাকায় হাজারো মানুষ সীমান্তের দিকে ছুটে এসেছিল।
এখন অনেক তরুণকে সীমান্ত ছেড়ে মহাসড়ক ধরে হেঁটে যেতে কিংবা ট্যাক্সির অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। কয়েক দিন ধরে শহরের অনেক দোকানও বন্ধ রয়েছে।
ফিরে আসা অভিবাসীরা জানিয়েছেন, সেউতায় সুপারমার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় তারা খাবার ও পানির জন্য চরম দুর্ভোগে পড়েন। ভেজা কাপড় পরে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতেই সেগুলো শুকানোর চেষ্টা করেছেন।
মরক্কোর তাঞ্জের মেড বন্দরে কর্মরত এক ব্যক্তি, যিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, 'সেউতা ছিল যেন একটি কারাগার। সেখানে করার মতো কিছুই ছিল না। সবকিছুই বন্ধ ছিল।'
কিছু অভিবাসী অভিযোগ করেন, সেউতার প্রধানত মরক্কান অধ্যুষিত এল প্রিন্সিপে এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের মারধর করেছেন বা এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এসব অভিযোগ যাচাই করতে পারেনি।
মরক্কোর ওয়েটার ইয়াসিন ইশু জানান, তাকেও ওই এলাকায় মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, 'তারা আমাদের ওপর এক ধরনের অবরোধ তৈরি করেছিল, যাতে আমরা নিজেরাই সেউতা ছেড়ে চলে যাই। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের পরিকল্পনায় সফল হয়েছে।'
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের পর সেউতায় পৃথক দুটি ছুরিকাঘাতের ঘটনায় দুইজন সামান্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের পর থেকে ছুরিকাঘাতে কারও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে সীমান্তের কাছে ফনিদেকের একটি হোটেলে কর্মরত রশিদ জানান, অভিবাসীদের ঢলের সময় তাদের হোটেলের রান্নাঘরের ছয়জন কর্মীই সেউতায় চলে যান। এখন পর্যন্ত তাদের কেউ ফেরেননি। ফলে নতুন কর্মী খুঁজতে হচ্ছে হোটেল কর্তৃপক্ষকে।
সেউতায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরতে শুরু করেছে। শহরের ক্যাফেগুলো আবার খুলেছে এবং ক্রেতারাও ফিরতে শুরু করেছেন। তবে বেশিরভাগ দোকান এখনো বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশি টহল চলছে।
শহরের কেন্দ্রস্থলে দুটি ক্যাফের মালিকের মেয়ে ২৪ বছর বয়সী মারিনা কাস্তানিও বলেন, 'আমরাই দোকান খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ শেষ পর্যন্ত জীবনকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতেই হবে। তবে আমাদের নিজেদের এবং কর্মীদের নিরাপত্তাই সবার আগে।'
তবে অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, শহরের উপকণ্ঠে এখনো উত্তেজনা রয়েছে।
একটি অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্রে কর্মরত এক সহায়তাকর্মী জানান, কেন্দ্রটি ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। নতুন কাউকে রাখার জায়গা নেই। তার ধারণা, এখনো কয়েক হাজার অভিবাসী সেউতায় অবস্থান করছেন।
স্থানীয় হার্ডওয়্যার দোকানের মালিক টিটো বলেন, এত বিপুল সংখ্যক মানুষের হঠাৎ আগমনে স্থানীয়রা ভয় পেয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তাদের প্রতি সহানুভূতিও অনুভব করছেন।
তিনি বলেন, 'আপনি একই সঙ্গে আতঙ্কিত ও অসহায় বোধ করবেন। ওই তরুণদের ভয়াবহভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে গেছে।'
৪৩ বছর বয়সী সুদানের নাগরিক মোহাম্মদ আহমেদ জানান, একটি ট্রাক তাকে এবং অন্য কয়েকজন অভিবাসীকে সীমান্তের কাছে নামিয়ে দেয়। এরপর তিনি টানা চার ঘণ্টা সাঁতরে সেউতায় পৌঁছান।
তার অভিযোগ, পুলিশ তাদের অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তা আটকে দিয়েছে। তবু তিনি স্পেনেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল।
তার ভাষায়, 'আমি আর ফিরে যাব না। এখানে চেষ্টা করতে করতেই মরতে রাজি আছি।'