০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩১

৬ মাসে ১৪ পর্বত জয়ের নায়ক নির্মলের করুণ মৃত্যু, প্রাণ গেল আরও ৯ জনের

নির্মল পুরজা   © সংগৃহীত

বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ পর্বত সবচেয়ে কম সময়ে জয় করে ইতিহাস গড়া নেপালের কিংবদন্তি পর্বতারোহী নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজার অভিযাত্রা শেষ হলো পাকিস্তানের ব্রড পিকে। ভয়াবহ তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে নিহত হয়েছেন আরও নয়জন পর্বতারোহী। শনিবার অভিযানের আয়োজক প্রতিষ্ঠান তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। দুর্গম এলাকায় মরদেহ শনাক্ত করা গেলেও সেগুলো এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেড ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে জানায়, ‘অত্যন্ত গভীর শোক ও ভেঙে পড়া হৃদয়ে আমরা নিশ্চিত করছি যে, ব্রড পিকে তুষারধসের ঘটনায় নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।’

পোস্টে আরও বলা হয়, ‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, এই অভিযানে থাকা অন্য সদস্যদেরও কয়েকজন বেঁচে নেই।’

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘পর্বতারোহীদের শুধু শারীরিক যাত্রাই থেমে গেছে। কিন্তু তাদের সাহস, নিষ্ঠা ও অবদানের ইতিহাস চিরকাল বেঁচে থাকবে এবং মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।’

৪৩ বছর বয়সী নির্মল পুরজা এবং আরও নয়জন পর্বতারোহী বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত ৮ হাজার ৫১ মিটার (২৬ হাজার ৪১৪ ফুট) উচ্চতার ব্রড পিকে তুষারধসের কবলে পড়েন। বিশ্বের দ্বাদশ সর্বোচ্চ এই পর্বতটি প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত কঠিন হিসেবে পরিচিত। দুর্ঘটনার পর থেকেই তারা নিখোঁজ ছিলেন।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্মল পুরজা ও অন্য পর্বতারোহীদের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনাস্থল অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এখনো সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ইতিহাস গড়া পর্বতারোহী

নির্মল পুরজা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুর্খা ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে তিনি ব্রিটিশ বিশেষ বাহিনীতেও কাজ করেন।

২০১৯ সালে মাত্র ছয় মাসের কিছু বেশি সময়ে বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত জয় করে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এর আগে এই কীর্তি গড়তে বছরের পর বছর সময় লেগেছিল অন্য পর্বতারোহীদের।

২০২১ সালে তার এই অভিযানের ওপর নির্মিত নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘14 Peaks: Nothing Is Impossible’ প্রকাশের পর তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘নির্মল পুরজা এবং অন্য পর্বতারোহীদের মৃত্যুর খবর জেনে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। তিনি ছিলেন একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষ। বহু বছর আমাদের সশস্ত্র বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অসাধারণ পর্বতারোহণের অভিযানের কথা সারা বিশ্ব জানে।’

উদ্ধার অভিযান চলছে

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ১০ জন পর্বতারোহী তুষারধসের মধ্যে পড়েন। তাদের মধ্যে ছয়জন নেপালের নাগরিক। বাকি চারজন পাকিস্তান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নাগরিক।

শুক্রবার অনুসন্ধানকারী দল তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে।

Seven Summit Treks-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছাং দাওয়া শেরপা জানান, নিহতদের মধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানের তিনজন শেরপা গাইড ছিলেন। ড্রোনে ধারণ করা ভিডিওর মাধ্যমে বাকি মরদেহগুলো শনাক্ত করা হয়েছে।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘মরদেহগুলো শনাক্ত করা গেছে। কিন্তু সেগুলো এমন একটি কঠিন জায়গায় রয়েছে, যেখান থেকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানে নেপালের মতো পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টারের লং-লাইন উদ্ধার পদ্ধতি চালু নেই।

তার ভাষায়, ‘যারা মরদেহ উদ্ধারে যাবেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।’

পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের পর্যটন বিভাগের উপপরিচালক সাজিদ হুসেইন জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘উদ্ধারকারী দল সফলভাবে নিহতদের অবস্থান শনাক্ত করেছে। তবে এখনো নিরাপদে তাদের মরদেহ নিচে নামানো সম্ভব হয়নি।’

তিনি আরও জানান, ড্রোন নজরদারি ও আকাশপথে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিহতদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করা গেলেও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।

রেখে গেলেন অনন্য উত্তরাধিকার

২০১৯ সালে নির্মল পুরজা প্রথমে বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা জয় করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার বাকি পর্বতগুলোও জয় করেন।

বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ পর্বতের মধ্যে আটটি নেপালে, পাঁচটি পাকিস্তানে এবং একটি চীনের তিব্বত অঞ্চলে অবস্থিত।

বিশ্বের অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা নির্মল পুরজাকে একজন ‘ক্যারিশম্যাটিক ও বর্ণিল ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে স্মরণ করেছেন।

শেরপা নন, এমন পর্বতারোহীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০ বার এভারেস্ট জয় করা ব্রিটিশ পর্বতারোহী কেনটন কুল রয়টার্সকে বলেন, ‘তার উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে উচ্চ পর্বতে গাইডিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে তিনি যে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, সেটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।’