ভাইরাল ভিডিও থেকে অভিবাসী সংকট—সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে নাড়িয়ে দিল স্পেনকে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভাইরাল ভিডিও ও বার্তা হাজারো মানুষকে স্পেনের স্বশাসিত অঞ্চল সিউতার দিকে ছুটে যেতে উৎসাহিত করেছিল। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, সমুদ্র পেরোলেই ইউরোপে প্রবেশের সুযোগ মিলবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে। অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু, ইউরোপজুড়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ—সব মিলিয়ে এই সংকটের কেন্দ্রে উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা।
রাজনীতির উত্তাপ
মরক্কো থেকে সাঁতরে স্পেনের স্বশাসিত অঞ্চল সিউতায় প্রবেশ করা হাজারো অভিবাসীর বেশিরভাগই এখন আবার মরক্কোতে ফিরে গেছেন। স্প্যানিশ সেনা ও পুলিশ তাদের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।
তবে এই নজিরবিহীন ঘটনার মাশুল ছিল ভয়াবহ। অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সমুদ্র থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভাসমান রাবারের টিউব ও ফ্লিপারের পাশেই পাওয়া গেছে অনেকের নিথর দেহ।
এই ঘটনা শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করেনি, ইউরোপের রাজনীতিতেও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে যে বিভক্তি রয়েছে, সেটি আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—হঠাৎ এত মানুষ কেন সিউতার দিকে ছুটে গেল? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ইউরোপে সহজে প্রবেশের’ বার্তা কি শুধু ভাইরাল হয়েছিল, নাকি এর পেছনে আরও পরিকল্পিত বা সংগঠিত কোনো উদ্যোগ ছিল?
এই সংকটের কারণ যাই হোক, স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ।
তিনি অভিযোগ করেন, সংকটের সময় স্পেনকে সমর্থন না দিয়ে কিছু দেশ রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং স্পেনের সমালোচনায় নেমেছে।
বিশেষ করে ইতালির দিকেই ইঙ্গিত করেন তিনি।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কট্টর ডানপন্থী দল ফ্রাতেল্লি দি ইতালিয়া দ্রুতই সিউতার রাস্তায় ছুটে চলা অভিবাসীদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে।
ছবির সঙ্গে লেখা হয়, ‘এটাই সেই সানচেজ মডেল, যেটি ইতালির বামপন্থীরা এত পছন্দ করে।’
এরপর মেলোনি ঘোষণা দেন, নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তির আওতায় মানুষের অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করছেন।
এতে মাদ্রিদে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
স্পেনের দাবি, পরিস্থিতি ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাছাড়া সিউতা শেনজেন অঞ্চলের অংশ নয়। ফলে মরক্কোর অভিবাসীরা কোনোভাবেই সেখান থেকে বাধাহীনভাবে মূল ইউরোপে যেতে পারতেন না।
স্পেনের মতে, মেলোনিও বিষয়টি জানেন।
তবে আগামী বছর ইতালিতে নির্বাচন। এ সময় তাঁর জোট নতুন এক কট্টর অভিবাসীবিরোধী দলের কাছে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। তাই কঠোর অবস্থান দেখিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার সুযোগ হিসেবে তিনি এই ঘটনাকে ব্যবহার করেছেন।
স্পেন কি খুব বেশি উদার?
অবশ্য শুধু ইতালিই নয়, ইউরোপের আরও অনেক দেশ মনে করে, স্পেন অভিবাসন নীতিতে তুলনামূলক নমনীয়।
মঙ্গলবার জরুরি ভিত্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকার যে আহ্বান মেলোনি জানিয়েছেন, সেটিতে প্রায় দুই ডজন সদস্যরাষ্ট্রের সরকারপ্রধান সমর্থন দিয়েছেন।
তাদের যৌথ বিবৃতিতে ইউরোপে অভিবাসীদের আকৃষ্ট করতে পারে—এমন সব নীতি বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মূলত তারা স্পেনের সেই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে, যার মাধ্যমে কয়েক লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসীকে বৈধভাবে বসবাস ও কাজের অনুমতির জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
স্পেন সরকার বলছে, দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে যাচ্ছে। তাই কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। সেই বাস্তবতা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে সিউতার সৈকতে যারা ছুটে গিয়েছিল, তারা এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাচ্ছিল না। কারণ সেই আবেদন প্রক্রিয়া অনেক আগেই শেষ হয়েছে।
বরং প্রধানমন্ত্রী সানচেজ অন্য একটি কারণের কথা বলেছেন।
সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, সমুদ্রপথে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।
সানচেজের দাবি, মানবপাচারকারীরা এই রায়কে বিকৃতভাবে প্রচার করে মানুষকে বোঝিয়েছে যে, সমুদ্রপথে এলেই ইউরোপে থেকে যাওয়া সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করল
তবে সিউতায় যাওয়া অধিকাংশ মানুষকে মানবপাচারকারীদের টাকা দিতে হয়নি। কারণ তারা বেশিরভাগই মরক্কোর নাগরিক এবং এই পথ তাদের পরিচিত।
বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তাদের প্রধান উৎসাহের জায়গা হয়ে ওঠে।
অনেক অভিবাসী সাংবাদিকদের এমন ভিডিও দেখিয়েছেন, যেখানে মানুষ চিৎকার করে বলছে, ‘স্পেন খুলে গেছে’, এরপরই তারা সমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছে।
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বহু অ্যাকাউন্ট দেখা গেছে, যেখানে তরুণরা ওয়েটস্যুট ও ফ্লিপার পরে সাঁতার কাটছে কিংবা সিউতার ভেতর থেকে ভিডিও প্রকাশ করছে।
এসব অ্যাকাউন্টের অনেকগুলো মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে চালু হয়েছে। আবার কয়েকটির ভিডিওতে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার লাইকও রয়েছে।
কিন্তু তাদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতিই শেষ পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
যারা আনন্দে সিউতার উপকূলে পৌঁছেছিল, তারা সেখানে গিয়ে খাবার, আশ্রয় কিংবা ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার কোনো সুযোগই পায়নি।
ফলে বেশিরভাগ মানুষ দ্রুতই আবার মরক্কোয় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
তাহলে এই ঘটনার পেছনে কী ছিল?
প্রশ্ন উঠেছে, কয়েক বছর আগে বেলারুশ যেভাবে অভিবাসীদের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, এখানেও কি তেমন কিছু ঘটেছে?
যদি হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে কারা ছিল?
এ মুহূর্তে নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায়নি।
তবে এই ঘটনার রাজনৈতিক ফল ভোগ করছে বিভিন্ন পক্ষ।
স্পেনের সংবাদপত্র এল পাইস-এর সাংবাদিক আন্দ্রেয়া রিজ্জি লিখেছেন, বিশ্বজুড়ে ডানপন্থীরা এই ঘটনায় ‘আনন্দে আত্মহারা’।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করায় স্পেনের ওপর ক্ষুব্ধ, এই ঘটনাকে ‘বিপর্যয়’ এবং ‘আক্রমণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
মেলোনির মতো তাঁর সামনেও নির্বাচন রয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট।
ইউরোপে বিশৃঙ্খলা ও বিভক্তি তৈরি হলে তা ইউক্রেনের মিত্রদের দুর্বল করবে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মরক্কো অবশ্য পুরো ঘটনার জন্য ‘অপরাধী চক্রকে’ দায়ী করেছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্তরক্ষীরা যখন হাজারো মানুষকে একত্র হতে দেখেছে, তখন কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
এর আগেও একবার ছোট পরিসরে এমন ঘটনা ঘটেছিল। তখন পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে উত্তেজনা চলছিল।
বর্তমানেও দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কিছু উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ মরক্কোকে দোষারোপ করতে রাজি নন।
তিনি রাবাতকে ‘ভালো মিত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অবশ্য তাঁর সমালোচকদের দাবি, এটি অতিরিক্ত নমনীয় অবস্থান। তাদের মতে, সরকারের আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল।
এখন কী হচ্ছে?
স্পেন এখন নতুন করে এমন ঘটনা ঠেকাতে সিউতার নিরাপত্তা জোরদার করছে।
সীমান্তের বেড়া সমুদ্র পর্যন্ত আরও বাড়ানো হচ্ছে।
জেটির পাশে দীর্ঘ সারিতে কমলা রঙের ভাসমান বয়া বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি সেখানে টহল দেবে জাহাজ, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সাঁতরে সীমান্ত পার হতে না পারে।
আগামী সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসবেন। সেখানে বহির্সীমান্ত আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এতে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো আরও উৎসাহিত হয়েছে।
এদিকে কয়েক সপ্তাহের জন্য স্পেন থেকে ইতালিতে যাওয়া যাত্রীদের কাগজপত্র এলোমেলোভাবে পরীক্ষা করবে ইতালির পুলিশ।
অর্থাৎ আপাতত বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন আসছে না।
কিন্তু যেসব তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা স্বপ্নের পেছনে ছুটে সমুদ্রে নেমেছিল, তাদের অনেকেই আর জীবিত বাড়ি ফিরতে পারেনি। তাদের মরদেহ এখন কফিনে করে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে মরক্কোতে।