২৮ জুলাই ২০২৬, ২১:২২

জড়িত থাকলে ১০ বছরের জেল, ১৩ কোটি টাকা জরিমানা

ভারতের পরীক্ষার্থীরা   © সংগৃহীত

সংগঠিত নকল, প্রশ্নফাঁস এবং পাবলিক পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধে ভারতের সংসদ প্রথম নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করার দুই বছর পর এই বড় সিদ্ধান্তটি নিয়েছে সরকার।

ভারত সরকার প্রশ্নফাঁস বিরোধী ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার পরীক্ষা জালিয়াতির ঘটনা মোকাবিলায় কঠোর শাস্তি, বিপুল অর্থদণ্ড এবং বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিন্স) অ্যাক্ট, ২০২৪’-এর প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ইতোমধ্যে অনুমোদন করেছে এবং শিগগিরই তা সংসদে উত্থাপন করা হবে। আইনের মূল অপরাধগুলোর সংজ্ঞায় কোনো পরিবর্তন না আনলেও, দেশজুড়ে প্রশ্নফাঁস এবং নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা বহুলাংশে শক্তিশালী করতে চাইছে।

সংগঠিত নকল, প্রশ্নফাঁস এবং বড় পাবলিক পরীক্ষায় জালিয়াতি বন্ধে পার্লামেন্ট দেশের প্রথম নির্দিষ্ট আইন করার দুই বছর পর এই পদক্ষেপ এল।

কারাদণ্ড এবং জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বাড়ছে
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষা জালিয়াতিতে দোষী প্রমাণিত হলে তাকে ন্যূনতম পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে, যা বর্তমান আইনে ছিল তিন বছর। সর্বোচ্চ শাস্তির মেয়াদও পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

একই সাথে ব্যক্তি পর্যায়ে আর্থিক জরিমানার পরিমাণও অনেক বাড়ানো হচ্ছে। সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ ১২.৯ লাখ টাকা (১০ লাখ রুপি) থেকে বাড়িয়ে ৬৪.৫ লাখ টাকা (৫০ লাখ রুপি) করা হচ্ছে।

সরকারি সূত্রের মতে, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো সংগঠিত পরীক্ষা জালিয়াতি কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোতে পরীক্ষা পরিচালনা, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান বা লজিস্টিকস সামলানোর দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে এ ধরনের সেবাদানকারী সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ ১.২৯ কোটি টাকা (১ কোটি রুপি) জরিমানা, পরীক্ষার খরচ বহন এবং চার বছরের জন্য পরীক্ষা পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে পারে।

নতুন সংশোধনীতে সর্বোচ্চ জরিমানা বাড়িয়ে ৬.৪৫ কোটি টাকা (৫ কোটি রুপি) করা এবং নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আট বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে পরীক্ষার খরচ আদায়ের বিধানটি আগের মতোই বজায় থাকছে।

কর্মকর্তাদের মতে, সংগঠিত পরীক্ষা জালিয়াতি অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঘটে। তাই সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা বাড়বে
সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর পরিচালক, শীর্ষ নির্বাহী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য ব্যক্তিরা যদি পরীক্ষা জালিয়াতিতে জড়িত থাকেন, তবে তাদের জন্যও কঠোর শাস্তির প্রস্তাব করেছে কেন্দ্র।

এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কারাদণ্ড তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হচ্ছে, তবে সর্বোচ্চ কারাদণ্ড ১০ বছরই থাকছে। আর জরিমানার পরিমাণ ১.২৯ কোটি টাকা (১ কোটি রুপি) থেকে বাড়িয়ে ৬.৪৫ কোটি টাকা (৫ কোটি রুপি) করা হচ্ছে।

পরীক্ষা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সংস্থাগুলোর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনের লক্ষ্য।

সংগঠিত অপরাধের শাস্তির ধারা শক্তিশালীকরণ
প্রশ্নফাঁসকারী চক্র বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে নতুন এই সংশোধনী।

বর্তমানে পরীক্ষা জালিয়াতি সংক্রান্ত সংগঠিত অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের জেল এবং সর্বনিম্ন ১.২৯ কোটি টাকা (১ কোটি রুপি) জরিমানার বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে সর্বনিম্ন কারাদণ্ড বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়েছে এবং সর্বনিম্ন জরিমানার পরিমাণ ১০ গুণ বাড়িয়ে ১২.৯ কোটি টাকা বা প্রায় ১৩ কোটি টাকা (১০ কোটি রুপি) করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে সর্বোচ্চ কারাদণ্ডের মেয়াদ আগের মতোই ১০ বছর থাকছে।

পরীক্ষা জালিয়াতি মামলার জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত
আইন সংশোধন প্যাকেজের অন্যতম প্রধান পরিবর্তন হলো একটি নির্দিষ্ট বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা চালু করা।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচারের জন্য রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত নির্দিষ্ট করতে হবে। এই আদালতগুলো প্রতিদিন শুনানি গ্রহণ করবে এবং মুলতবি বা সময় দেওয়া যথাসম্ভব কমাবে।

চার্জশিট জমা দেওয়ার তিন মাসের মধ্যে যাতে বিচারকাজ শেষ হয়, সরকার সেই প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে চলমান মামলাগুলোকেও এই নতুন আদালতগুলোতে স্থানান্তর করা হবে।

বড় বড় পরীক্ষা জালিয়াতি মামলার তদন্ত ও বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায় বলে যে সমালোচনা রয়েছে, তা দূর করতেই সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

তদন্তের জন্য দুই মাসের সময়সীমা
এই সংশোধনীর মাধ্যমে তদন্ত শেষ করার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যমান আইনে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের নাম উল্লেখ থাকলেও তদন্ত শেষ করার কোনো সময়সীমা ছিল না। তবে সংশোধিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী সংস্থাগুলোকে দুই মাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।

রাজ্য পুলিশ, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এবং এসব মামলার জন্য গঠিত যেকোনো বিশেষ টাস্কফোর্সের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা প্রযোজ্য হবে।

কর্মকর্তাদের মতে, বিলম্বিত তদন্ত অপরাধীদের ভয় পাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয় এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে পারবে কেন্দ্র
প্রস্তাবিত সংশোধনী কেন্দ্রকে পরীক্ষা সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের ক্ষমতা দেবে।

বর্তমানে এসব মামলা সরাসরি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে হস্তান্তর করা যায়। তবে নতুন বিধান চালু হলে বিশেষভাবে গঠিত দলগুলো জটিল বা বড় ধরনের প্রশ্নফাঁস চক্রের স্বাধীন তদন্ত করতে পারবে।

বিশেষ কৌঁসুলি এবং নির্ধারিত সময়ে আপিল নিষ্পত্তি
ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতগুলোতে মামলা পরিচালনার জন্য রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি (স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর) নিয়োগ করতে হবে।

সংশোধনীতে আপিল প্রক্রিয়ার জন্যও একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের দুজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সরাসরি আপিল শুনবেন এবং যথাসম্ভব তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করবেন।

নতুন আইন করা থেকে জোরদার প্রয়োগের দিকে পদক্ষেপ
২০২৪ সালের আইনটি প্রশ্নফাঁস এবং সংগঠিত নকলের বিরুদ্ধে একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলো থেকে স্পষ্ট যে, সরকার এখন দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে।

জরিমানা ও শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি কঠোর সময়সীমা এবং বিশেষ আদালত গঠনের মাধ্যমে কেন্দ্র নিশ্চিত করতে চাইছে যে, পরীক্ষা জালিয়াতির মামলাগুলো যেন ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত নিষ্পত্তিসম্পন্ন হয়।