‘আমি সব উপায়ে নিজেকে উৎসর্গ করব’—পদত্যাগ করে দীর্ঘ স্ট্যাটাস ভারতীয় শিক্ষামন্ত্রীর
নিয়োগ ও বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে টানা বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হিন্দি ভাষায় দেওয়া এক পোস্টে ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজেই পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। খবর এনডিটিভির।
এক্স বার্তায় দেওয়া ধর্মেন্দ্র প্রধানের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
আমার তরুণ বন্ধুরা, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছি। আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী শিক্ষাব্যবস্থাই একটি সমৃদ্ধ জাতির মূল ভিত্তি। আমি দেশের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি ও যৌক্তিক প্রত্যাশাকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ভারতের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণ করা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের একটি নৈতিক অঙ্গীকার ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশকে সেবা করার সুযোগ দেওয়ায় আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
তবে ২০২৬ সালের ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় কিছু অনিয়ম প্রকাশ্যে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি আমলে নিয়ে ভারত সরকার সিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়, পরীক্ষা বাতিল করে এবং পুনরায় পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে এই পরীক্ষা সিবিটি (কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা) পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পুরো সময়জুড়ে আমাদের মূল অগ্রাধিকার ছিল ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। কেন্দ্র সরকার, রাজ্য সরকার এবং বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় গত ২০২৬ সালের ২১ জুন পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
প্রথম দিন থেকেই আমি পুরো দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়েছি এবং কখনোই পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আমি সংকল্পবদ্ধ ছিলাম যাতে কোনও মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পরীক্ষা মাফিয়াদের কারণে নষ্ট না হয় এবং কারও ওপর কোনও অন্যায় না ঘটে। গত ১৬ জুলাই প্রকাশিত নিট-ইউজি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক ছিল, যেখানে বঞ্চিত পটভূমি থেকে আসা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সাফল্য অর্জন করেছে।
আন্দোলন সংক্রান্ত আরও নিউজ: বাবা বিজেপি জোটের মন্ত্রী, মেয়ে ‘ককরোচ পার্টির’ আন্দোলনে
তবে এই সময়েও দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, যা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। আমি সব সময় আমাদের গণতন্ত্রের শক্তিতে অটল বিশ্বাস রেখেছি এবং তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেছি। তারা কেবল ভারতের ভবিষ্যৎ নয়; তারা নতুন ও উন্নত ভারতের মূল রূপকার ও পথপ্রদর্শক। গত ১০ দিনের ঘটনাবলীতে আমি ব্যথিত। এটি আমার জন্য কোনও ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়। ভারতের যুবশক্তিই এই দেশের প্রকৃত শক্তি। দেশের তরুণরা যেন কোনও বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে না পড়ে, সেটিই আমার সংকল্প।
যন্তর মন্তরসহ সারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে যাতে দেশবিরোধী কোনও শক্তি এটিকে কাজে লাগাতে না পারে, জাতীয় ঐক্য বজায় থাকে, আইনি জটিলতায় পড়ে কোনও ভারতীয় শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন নষ্ট না হয় এবং আমাদের সন্তানরা যাতে পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গঠনে মনোনিবেশ করতে পারে, সেসব দিক বিবেচনা করে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।
শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা, বিশ্বাস ও নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনের জন্য আমি তার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদের আমার সব সম্মানিত সহকর্মী, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যাদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। দেশের সেবা করা আমার জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার; আমি চিরকাল এই কাজে উৎসর্গীকৃত থাকব।
প্রভু জগন্নাথের কৃপায় আগামীতেও ভারতমাতা, ওড়িশার জনগণ এবং দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমি সব উপায়ে নিজেকে উৎসর্গ করে যাব।