শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াই যে কারণে অনশন ভাঙলেন সোনম ওয়াংচুক, জানালেন নিজেই
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়াই ২৬ দিনের অনশন ভাঙার কারণ নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের চেয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যেন কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
শনিবার রাতে প্রকাশিত ২৪ মিনিটের একটি ইউটিউব ভিডিওতে ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি সেটিকে প্রধান দাবি হিসেবে সামনে আনেননি। তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা এফআইআর না হওয়া।
গত ২৮ জুন থেকে ব্যঙ্গধর্মী রাজনৈতিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর সদস্যদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন ওয়াংচুক। দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নিয়ে সংগঠনটি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল।
‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ওয়াংচুক অনশন ভাঙেন।
তিনি জানান, কেন্দ্র সরকার লিখিতভাবে আশ্বাস দিয়েছে যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না। পাশাপাশি পরীক্ষা সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা এবং নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।
তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিশ্চিত না করেই অনশন ভাঙায় সমালোচনার মুখে পড়েন ওয়াংচুক।
এর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করাকে অপরিহার্য মনে করিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদত্যাগ সরকারের জন্য তেমন বড় বিষয় নয়। কিন্তু পদত্যাগ না করায় তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে।’
সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ওয়াংচুক বলেন, ‘তাদের সুনাম সারা দেশে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হচ্ছে।’
তিনি বিশ্বাস করেন, শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজেই পদত্যাগ করবেন।
ওয়াংচুক বলেন, ‘আমি জানতাম, সরকার এভাবে বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না এবং একসময় না একসময় পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতেই হবে। আমি জানতাম, এই বিষয়টি খুব দ্রুতই নিজে থেকেই সমাধান হয়ে যাবে। কারণ এর ফল ভোগ করছে সরকারই। তাই আমি এই দাবিতে অতিরিক্ত চাপ দিইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ছিল আইনি ব্যবস্থা ও এফআইআর নিয়ে। তাই আমি মনে করিনি, ব্যক্তিগতভাবে মন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করাটা আমার দায়িত্ব।’
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, চলমান আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি অব্যাহত রাখবে।
সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে—এমন অভিযোগও নাকচ করে দিয়েছেন ওয়াংচুক।
তিনি বলেন, তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের যেন সহিংসতা বা আইনি হয়রানির মুখে পড়তে না হয়।
ওয়াংচুক বলেন, ‘গত রাতে প্রায় মধ্যরাতে আমাকে জানানো হয়, মন্ত্রীরা লিখিত আশ্বাস দিতে রাজি হয়েছেন। আমি খুব তাড়াহুড়ো করছিলাম, কারণ দিল্লির পরিস্থিতি এমন ছিল যে বড় ধরনের দমন-পীড়নের আশঙ্কা ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখছিলাম। তখন ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের কথা মনে পড়ে যায়, যখন লাদাখের তরুণদের ওপর পুলিশ ও সিআরপিএফ নির্মমভাবে গুলি চালিয়েছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, এখানেও তেমন কিছু ঘটতে পারে। তাই মনে হলো, আমি যদি অনশন ভেঙে শান্ত থাকার আহ্বান জানাই, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি শান্ত হবে।’
অনশন ভাঙার সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতি নিয়েও সমালোচনার জবাব দেন তিনি।
ওয়াংচুক বলেন, ‘যদি আমার সমঝোতাই করার ইচ্ছা থাকত, তাহলে কি আমি ২৬ দিন অনশন করতাম? দিল্লির প্রচণ্ড গরমে অনশন করার বদলে কি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসেই সমঝোতা করা যেত না?’
তিনি জানান, গুরগাঁওয়ের মেদান্তা হাসপাতালে নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং তার সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তারা নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং পরীক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে সংসদে আলোচনা করার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেন।
ওয়াংচুক বলেন, ‘আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন লিখিত নিশ্চয়তা ছাড়া আমি অনশন ভাঙব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে তারা ক্ষতিপূরণ ও সংসদে আলোচনা করতে রাজি হলেও মামলা না করার বিষয়ে শুধু মৌখিক আশ্বাস দিচ্ছিলেন। আমি লিখিত আশ্বাস ছাড়া রাজি হইনি। শেষ পর্যন্ত তারা লিখিত নিশ্চয়তা দিতে বাধ্য হন।’
তিনি আশা করেছিলেন, সংসদ সদস্য, ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য এবং লাদাখ থেকে আসা প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনশন ভাঙবেন। কিন্তু তার দাবি, মন্ত্রীরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে তাদের অনেককেই তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
সবশেষে আবেগঘন কণ্ঠে ওয়াংচুক বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, আমার সহযোদ্ধারা, শিক্ষার্থীরা এবং আমাকে সমর্থন জানাতে আসা সংসদ সদস্যরা যখন আমি অনশন ভাঙি, তখন তারা আমার পাশে থাকতে পারেননি।’