দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি ৩৪ হাজার, এলাহাবাদের ৪ হাজার টাকা—বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের
ভারতের ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির জন্তর মন্তরে চলমান বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। দিন দিন সেখানে ভিড় বাড়ছে শিক্ষার্থীদের। শুধু নিট নয়, বেকারত্বসহ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন আন্দোলনকারীরা।
দিল্লির জন্তর মন্তরে অবস্থানরত কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এনডিটিভি জানিয়েছে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন।
এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা শুধু তাদের মনোবল ভেঙে দেয়নি, একই সঙ্গে আর্থিকভাবেও বড় ক্ষতির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিক্ষার্থীরা এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রয়াগরাজের শিক্ষার্থী অশ্বিনী কুমার বলেন, বাবার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের খরচ মায়ের পেনশনের ওপর নির্ভর করে। তিনি জানান, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোচিং, আবেদন ফি এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতসহ নানা খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়।
অশ্বিনী বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস হয়েছে। এরপর পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা কী করতে পারি? এমনকি পরীক্ষা হলেও ফলাফল প্রকাশের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।’
সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (ইউপিএসসি) পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বিবেক কুমার বলেন, এই আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষার জন্য নয়, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি।
তিনি বলেন, ‘পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।’
আরেক শিক্ষার্থী নাসিম খান বলেন, নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া চালুর ঘোষণা সরকার অনেক দেরিতে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তিন মাস পর তারা দ্রুত বিচার আদালত গঠনের কথা মনে করেছে। এই আন্দোলনের সাফল্য হলো, প্রথমবারের মতো সরকার শিক্ষার্থীদের কথা মনে করেছে।’
এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীদের দল ২০ জুলাই থেকে জন্তর মন্তরে অবস্থান করছে। সেখানে থাকা শিক্ষার্থী জয় সিং জানান, আন্দোলনের সময় খাবার নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। খাবার সরবরাহকারী অ্যাপের মাধ্যমে খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। রাস্তার পাশে বিছানো লাল কার্পেট দেখিয়ে তিনি জানান, সেখানেই তারা ঘুমান।
জন্তর মন্তরের এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই দিল্লির বাইরের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছেন।
দিল্লির বাসিন্দা সুশীল আহুজা, যিনি ‘গিটার আঙ্কেল’ নামে পরিচিত, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে নিজের গিটারে কবি দুষ্যন্ত কুমারের কবিতা গেয়ে শোনান। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরিও পরিচালনা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার কোনো সন্তান নেই, তাই এই শিক্ষার্থীরাই আমার সন্তান।’
উত্তরপ্রদেশের উন্নাও থেকেও একটি দল এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ককরোচ জনতা পার্টির স্বেচ্ছাসেবক সঙ্গম সিং বলেন, উন্নাও থেকে আসা শিক্ষার্থীরা তাঁর পরিচিত। বর্তমানে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে এবং ২৬ জুলাই থেকে আবার চালু হবে। তিনি জানান, গত ২০ দিন ধরে তিনি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
নিজের পাশে বসা এক শিক্ষার্থীর দিকে ইঙ্গিত করে সঙ্গম সিং বলেন, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি যেখানে প্রায় ৪ হাজার টাকা, সেখানে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের খালসা কলেজে ফি প্রায় ৩৪ হাজার টাকা। হোস্টেল খরচ যোগ করলে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো কৃষকের সন্তানরা কি এত বেশি ফি বহন করতে পারবে? এটি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের লড়াই এবং সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।’
জান্তর মন্তরের এই বিক্ষোভ শুরু হয় ৬ জুন। ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে নিট প্রশ্নফাঁসের পাশাপাশি সিবিএসইর অন-স্ক্রিন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি পরীক্ষাগুলো পরিচালনার পদ্ধতিতে বড় ধরনের সংস্কারের দাবিও জানানো হচ্ছে।
লাদাখের আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করার পর এই আন্দোলন আরও বেশি আলোচনায় আসে।