মোসাদের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জনকে ‘ভিত্তিহীন’ বললেন আহমাদিনেজাদ
ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ সহায়তায় পুনরায় ইরানের ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করেছেন—এমন অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, হাস্যকর ও ‘হলিউডি কল্পকাহিনি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন রক্ষণশীল বলে পরিচিত ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তাকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক ও সরকার পতনের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে যুক্ত বলে দাবি করা হয়। এই সংবেদনশীল গুঞ্জনের পরিপ্রেক্ষিতে উত্থাপিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বিবৃতি জারি করেছে আহমাদিনেজাদের ব্যক্তিগত দপ্তর।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপপ্রচার এতটাই অবিশ্বাস্য এবং কৌতুকপূর্ণ যে স্বাভাবিক সময়ে এগুলোর জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। তবে ইরানের বর্তমান সংবেদনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শত্রুদের পরিকল্পিত চক্রান্ত’ নস্যাৎ করার স্বার্থেই এই অভিযোগগুলো স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আহমাদিনেজাদকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তা নাকচ করে তার সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের রাস্তায় অবাধে হাঁটা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করার বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মাহমুদ আহমাদিনেজাদ হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে মোসাদের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে অত্যন্ত গোপনীয় এক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ সমর্থনে কীভাবে তাকে পুনরায় তেহরানের ক্ষমতায় বসানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয় যে, ২০২৫ সালে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে সম্ভাব্য ইরানি হামলা থেকে বাঁচাতে ইসরায়েলি এজেন্টরা বিশেষ অভিযানে আহমাদিনেজাদকে তেহরান থেকে সরিয়ে একটি নিরাপদ গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁর এই ইসরায়েল-সংযোগের অকাট্য প্রমাণ হাতে পেয়ে তাকে তেহরানে কড়া নজরদারিতে গৃহবন্দী করে রাখে।
তবে এসব দাবিকে পুরোপুরি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে আহমাদিনেজাদের কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনা করছেন এবং জনগণের মাঝেই রয়েছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে জড়িয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের গুঞ্জন ডালপালা মেলেছে। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান কমান্ডার ইসমাইল কানির অন্তর্ধান ও গতিবিধি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে, যদিও কোনো স্বাধীন সূত্র থেকে এসব জল্পনা-কল্পনার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বিশ্বমঞ্চে একজন কঠোরপন্থী ও আপসহীন নেতা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তবে তার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিতর্কিত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার করার কারণে তিনি তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েন।
২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর দেশটিতে ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামের এক ঐতিহাসিক গণবিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, যা ছিল ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলন।
গত দুই দশকে আহমাদিনেজাদ অন্তত পাঁচবার ইরানের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জোর চেষ্টা চালালেও দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল ২০১৭, ২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থীতা বাতিল করে দেয়। এছাড়া, তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে মার্কিন নাগরিকদের অন্যায়ভাবে আটকে রাখার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২৩ সালে মার্কিন প্রশাসন তাঁর ওপর কঠোর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিল।