ফের জেন জি বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ২৫ বছর বয়সী এক রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালকের আত্মাহুতির ঘটনায় দেশজুড়ে নতুন করে তীব্র গণক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) রাজধানীর প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সিংহদরবার সচিবালয়ের সামনে শত শত মানুষ সমবেত হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা দরিদ্র মেহনতি মানুষের প্রতি নির্যাতন বন্ধ, মানবাধিকার রক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান।
নিহত যুবকের নাম গণেশ নেপালি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার তিনি এক যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকাকালীন কাঠমান্ডু মহানগর পুলিশের (মেট্রোপলিটন সিটি পুলিশ) সদস্যরা এসে আচমকা তার মোটরসাইকেলের চাকার সঙ্গে ‘হুইল লক’ লাগিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকা লক করার অন্যায্য প্রতিবাদে এবং ক্ষোভে গণেশ তাৎক্ষণিকভাবে নিজের শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার তিনি মারা যান।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, গণেশের এই নির্মম মৃত্যুর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই ঘটনার প্রতিবাদে আবারও রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নগর প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র, পথের ক্ষুদ্র হকার ও নদীতীরবর্তী বস্তিবাসীদের প্রতি অত্যন্ত অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করে আসছে। তারা অবিলম্বে অবৈধ গ্রেপ্তার বন্ধ এবং উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের দাবি জানান।
নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র (বালেন) শাহ ২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর পর থেকেই ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অনানুষ্ঠানিক বাজার উচ্ছেদ এবং নদীতীরের বস্তি সরানোর মতো নগর সৌন্দর্যবর্ধন অভিযানে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেন। এসব উচ্ছেদ অভিযানের সময় এর আগেও বহুবার প্রশাসনের সাথে সাধারণ মানুষের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সমালোচকদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্রশাসনের মানবিকতার চরম ঘাটতি জনমনে দীর্ঘদিনের তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে, যা এই আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে বিস্ফোরিত হলো।
এদিকে নেপালের আইন বিশেষজ্ঞদের দাবি, কাঠমান্ডু মহানগর পুলিশ তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট লঙ্ঘন করছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রাজু চাপাগাই দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-কে বলেন, মহানগর পুলিশের মূল দায়িত্ব হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহায়তা করা এবং জনগণের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা। তাদের বলপ্রয়োগ, নাগরিকদের সম্পত্তি জব্দ বা কাউকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার কোনো আইনগত ক্ষমতাই নেই।
নেপালের সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নিজস্ব পৌর পুলিশ গঠন করতে পারলেও ২০২৩ সালের কাঠমান্ডু মহানগর পুলিশ আইনে তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। মূলত পৌর সম্পদ রক্ষা, পার্ক ও পরিচ্ছন্নতা তদারকি এবং স্থানীয় উৎসব ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করার মধ্যেই তাদের পরিধি সীমাবদ্ধ।
নেপাল পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল পূর্ণ চন্দ্র যোশী এই বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ বা বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হলে তা একমাত্র নেপাল পুলিশের (জাতীয় পুলিশ) দায়িত্ব; পৌর পুলিশ স্বাধীনভাবে কোনো নাগরিকের ওপর এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে না।
তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বাস্তবে আইনসিদ্ধ সীমা ও তোয়াক্কা না করে মহানগর পুলিশ দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করে আসছে। পথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নগর পুলিশের চালানো নির্মম অভিযানের একাধিক ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। গণেশ নেপালির এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই আবারও রাজপথে রূপ নিয়ে বর্তমান সরকারের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।