মধ্যপ্রাচ্যের ৫ দেশে ফের একযোগে হামলা চালাল ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়ে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে একযোগে অতর্কিত ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দুই দেশের এই মুখোমুখি সামরিক সংঘাতের জেরে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন এক ভয়াবহ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (১২ জুলাই) রাতে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বিমান হামলা শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বেআইনি আধিপত্য ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ঠেকাতেই তারা এই সামরিক পদক্ষেপ চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলার তীব্র জবাব দিতেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা এই বিধ্বংসী আক্রমণ শুরু করে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, রবিবার ভোরে দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত এলাকা—বন্দর আব্বাস, সিরিক, জাস্ক, কেশম দ্বীপ এবং খুজেস্তান প্রদেশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দফায় দফায় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটায়। মার্কিন বাহিনীর এই হামলায় ইরানের কোস্টাল রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানি ভূখণ্ডে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা আঘাত আসে। বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) সম্ভাব্য বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় উচ্চশব্দে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। কাতার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের আকাশসীমায় ধেয়ে আসা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে, তবে এর ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক শিশুসহ অন্তত তিনজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।
একই সাথে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের বিমান ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সার্বক্ষণিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, জর্ডান সরকার নিশ্চিত করেছে যে ইরানের দিক থেকে ছুড়ে দেওয়া অন্তত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সরাসরি তাদের ভূখণ্ডে এসে পড়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছে যে, তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর একটি অন্যতম প্রধান কমান্ড, কন্ট্রোল সেন্টার এবং ড্রোন হ্যাঙ্গার সফলভাবে ধ্বংস করেছে। এছাড়া কুয়েতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার সাইট লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সাথে কাতারে মার্কিন যুদ্ধবিমানের একটি বিশেষ জেট রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও তাদের মূল কমান্ড স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ওমানের দুকম বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য রাখা রসদ সরবরাহ কেন্দ্র এবং মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর জ্বালানি ভরার প্রধান সুবিধাগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরক ড্রোনের আঘাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে আইআরজিসি দাবি করেছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের আকাশসীমা ও সীমান্তের বাইরেই ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিগুলো নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হবে। দুই পরাশক্তির এই অনড় অবস্থানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে চরম অস্থিরতাসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।