শিক্ষার্থীদের যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করছে রাশিয়া
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে পঞ্চম বছরে টেনে নিয়ে যেতে এবার বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণ শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেছে রাশিয়া। চলতি বছরের শুরু থেকেই রুশ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে উদ্বুদ্ধ করার এক ব্যাপক প্রচারণামূলক অভিযান শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছে কিংবা সাময়িকভাবে শিক্ষা বিরতি (একাডেমিক লিভ) নেওয়ার কথা ভাবছে, তাদেরই মূল নিশানা করা হচ্ছে। খবর বিবিসির
এই প্রচারণায় ড্রোন ইউনিটগুলোকে যুদ্ধের তুলনামুলক অভিজাত’ ও উন্নত প্রযুক্তিগত নিরাপদ পথ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে তরুণ শিক্ষার্থীদের এই লোভনীয় ফাঁদে ফেলে ফ্রন্টলাইনে পাঠানোর পর তাদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, যা রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরাপদ যুদ্ধক্ষেত্রের দাবিকে অসার প্রমাণ করেছে।
বিবিসি রাশিয়ান, মিডিয়াজোনা এবং একটি রাশিয়ার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন তিন তরুণ রুশ শিক্ষার্থীর —আভেরিন, গরবুনভ এবং আবদুলিনের করুণ পরিণতি। ১৮ বছর বয়সী রাখিম আবদুলিন ঝালাইয়ের (ওয়েল্ডিং) কাজ শিখতে কুমেরতাউ মাইনিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। পড়াশোনা মনমতো না হওয়ায় এবং বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় গত জানুয়ারিতে তিনি ড্রোন অপারেটর হিসেবে সামরিক চুক্তিতে সই করেন। নিরাপদ ভাবলেও ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে, গত ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়।
একইভাবে রেলওয়ে কনস্ট্রাকশনের ছাত্র ভ্লাদিস্লাভ গরবুনভ (১৮) চুক্তি সইয়ের মাত্র ৪ মাসের মাথায় গত ৬ এপ্রিল নিহত হন। এতিমখানায় বড় হওয়া ভ্যালেরি আভেরিন নামের অপর এক কারিগরি ছাত্রকে ড্রোন অপারেটরের প্রশিক্ষণের পর পাঠানো হয়েছিল ফ্রন্টলাইনে। গত ৮ এপ্রিল লুহানস্কের কাছে এক মর্টার হামলায় তিনিও প্রাণ হারান।
উন্মুক্ত তথ্য উৎস, কবরস্থান, যুদ্ধস্মারক, সরকারি রেজিস্টার এবং শোকবার্তা বিশ্লেষণ করে বিবিসি এ পর্যন্ত ২ লাখ৩০ হাজার৪০৭ জন রুশ সেনা ও কর্মকর্তার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি প্রকৃত মৃত্যুর মাত্র ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ। সেই হিসাবে রাশিয়ার প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৪ লাখ১৭ হাজার থেকে ৫ লাখ৯ হাজার৫০০ এর মধ্যে।
চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ এই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ বলে দাবি করে। অন্যদিকে ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতিও ব্যাপক। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫৫ হাজার সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন অত্যন্ত কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেওয়ায় রাশিয়া ‘আনম্যানড সিস্টেমস ট্রুপস’ বা ড্রোন বাহিনীর জন্য বিশেষ এক বছরের চুক্তির অফার দিচ্ছে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভ গত বছরের নভেম্বরে জানিয়েছিলেন, ৩৫ বছরের কম বয়সীরা নতুন প্রযুক্তিতে দ্রুত অভ্যস্ত হওয়ায় তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এরপরই রাশিয়ার প্রায় ২৭০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এই নিয়োগের জোর প্রচার চালানো হয়। মস্কোর শিক্ষার্থীদের প্রথম বছরেই প্রায় ৫০ লাখ রুবল (৫৭ হাজার ডলার) অর্থসহ স্নাতকোত্তরে সহজ সুযোগ এবং উন্নত বাসস্থানের লোভ দেখানো হচ্ছে।
তবে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়ার এই এক বছরের চুক্তির প্রতিশ্রুতি আসলে একটি ফাঁদ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পুতিনের আংশিক গতিশীলতা ডিক্রি অনুযায়ী, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তিগুলোর মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়তেই থাকবে। ফলে ১২ মাস পর কোনো তরুণেরই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার সুযোগ নেই।
তাছাড়া ড্রোন অপারেটরের কাজকে ফ্রন্টলাইন থেকে দূরে ও নিরাপদ বলা হলেও, বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এখন দুই পক্ষেরই ‘হাই-ভ্যালু টার্গেটে’ পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৯২০ জন রুশ ড্রোন অপারেটরের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে, যা ফ্রন্টলাইনের গোলন্দাজ বাহিনীর (Artillery) ক্ষয়ক্ষতির সমতুল্য। অনেক ক্ষেত্রে ড্রোন ইউনিটের কথা বলে চুক্তিতে সই করিয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ পদাতিক বাহিনী হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আর্থিক প্রলোভনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক চাপও সৃষ্টি করা হচ্ছে। নভোসিবিরস্কের একটি কলেজে চুক্তি সই করতে রাজি না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ‘কাপুরুষ’ বলে গালমন্দ করেন পরিচালক। সুদূর প্রাচ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ৩২ জন শিক্ষার্থীকে যুদ্ধে পাঠানোর কোটা দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে, যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একে ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছে। রাশিয়ার এই নীতি প্রমাণ করে যে, পুতিন সরকার এখন যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে সাধারণ বেসামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা গ্রাস করতে শুরু করেছে।