০৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৩

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২ হাজার ৬৪৫, ক্ষয়ক্ষতি ৬৭০ কোটি ডলারের বেশি

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপ  © সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় ২৪ জুন ভোরে ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৬৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬৬৬ জনের বেশি। দেশটির ইতিহাসে গত ১২৬ বছরের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার দুর্যোগ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ৮৬ হাজার ১১৭টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পে ৮৮৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৯টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৬৭০ কোটি) ডলারের বেশি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী অংশ নিয়েছেন। এছাড়া রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী দুর্গত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্যমতে, বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আশ্রয়কেন্দ্র ও খোলা আকাশের নিচে বসবাস করায় সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।

নাসার স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়েছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে, যা সরকারের প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।

মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি দ্রুত স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং চিকিৎসকদের দেশত্যাগের কারণে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও চাপে পড়েছে।

কারাকাসের হাসপাতাল দেল ওয়েস্তে ড. হোসে গ্রেগরিও হার্নান্দেজের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ইউজেনিও কোভা বলেন, দুর্যোগে আহত রোগীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে, যা বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সংস্থার মুখপাত্র ভেরোনিক দুরো বলেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৯০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে। মানবিক সহায়তাবাহী বিমান অবতরণের সুবিধার্থে মার্কিন বাহিনী কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে মেরামত করেছে। পাশাপাশি উপকূলে নৌবাহিনীর জাহাজ এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আরও ১০০ সদস্য ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন।

এ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ ও বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। তবে ইউএনডিপি বলছে, মোট ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

এরই মধ্যে ইকুয়েডর, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৫০টি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা কয়েকটি দেশের উদ্ধারকারীরাও মানবিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। আর ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটি একই অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার দূরে আঘাত হানে।

দেশটির যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৮৯০টি পরাঘাত (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯০০ সালের সান নারসিসো ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প ছিল। ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৬ থেকে ৭ দশমিক ৭, যাতে রাজধানী কারাকাসসহ উত্তর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।