খাবারে কৃত্রিম রংয়ের ব্যবহার বন্ধ করার ঘোষণা দিল নেসলে
বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ভোক্তা বাজার ও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কারণে খাবারে বিশেষ করে ফাস্টফুড আইটেমে স্বাদ ও লোভনীয় করে উপস্থাপন করার অজুহাতে কৃত্রিম রং ব্যবহার করতে শুরু করে খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যেখানে এগিয়ে ছিল বহুজাতিক খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যসচেতনতা ও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নেসলে (Nestle)। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী নিজেদের সব ধরনের পণ্য থেকে কৃত্রিম খাদ্য রং বা ফুড কালারিং সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এই বহুজাতিক কোম্পানি।
মঙ্গলবার (৩০ জুন, ২০২৬) রয়টার্সকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে নেসলের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) স্টিফান পালজার এই লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম রং বর্জনকারী প্রথম কোনো প্রধান বা শীর্ষস্থানীয় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাম লেখাতে যাচ্ছে নেসলে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের পণ্য তালিকা থেকে কৃত্রিম খাদ্য রং পুরোপুরি বাদ দিয়েছে কোম্পানিটি। এবার সেই সফলতার ওপর ভিত্তি করেই বৈশ্বিক পর্যায়ে এই পদক্ষেপ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের ভেভেতে অবস্থিত নেসলের সদর দপ্তরে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্টিফান পালজার বলেন, ‘চলতি বছরের (২০২৬) শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে নেসলের যত পণ্য রয়েছে, তার সবকটি কৃত্রিম রঙমুক্ত করা হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে মেদ বা ওজন কমানোর ওষুধ ‘জিএলপি-১’ -এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের উপাদান নিয়ে বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের কড়া নজরদারির কারণে বড় বড় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্যকর পণ্য সরবরাহের জন্য তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। এর ফলে অনেক প্রস্তুতকারক ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য থেকে সিন্থেটিক ডাই (কৃত্রিম রং) এবং কর্ন সিরাপের মতো সুইটনার বা মিষ্টি উপাদান বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে যে, ভোক্তারা স্বাস্থ্যকর ডায়েটের দিকে ঝুঁকে পড়লে প্যাকেটজাত খাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেসলে এখন ওজন সচেতন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়াতে চাওয়া ভোক্তাদের টার্গেট করে পণ্য তৈরিতে জোর দিচ্ছে।
তবে কৃত্রিম রঙের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক উপাদান খুঁজে বের করা মোটেও সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন পালজার। তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি নেওয়া খুব সহজ ছিল না। এর পেছনে নেসলেকে বছরের পর বছর ধরে ব্যাপক গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। কারণ আমাদের প্রথমে সব ধরনের প্রাকৃতিক বিকল্প খুঁজে বের করতে হয়েছে, এরপর কারখানায় উৎপাদনের সময় সেগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হয়েছে এবং সবশেষে পণ্যের ‘শেলফ-লাইফ’ বা গুণগত মান কতদিন টিকে থাকে তা যাচাই করতে হয়েছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ভোক্তারা কৃত্রিম উপাদান পছন্দ করছেন না, তারা খাবারের আরও সহজ ও প্রাকৃতিক রেসিপি চান—আর সে কারণেই আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি।’
উল্লেখ্য, কৃত্রিম খাদ্য রঙের ক্ষতিকর দিক নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন স্বাস্থ্যসচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র এবং যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) কৃত্রিম খাদ্য রং প্রত্যাহারের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে। সংস্থাটি জানিয়েছিল, কৃত্রিম রঙের সাথে শিশুদের মনোযোগের ঘাটতিজনিত রোগ (ADHD), স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে।
যদিও অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে আইনি বাধ্যবাধকতার আগেই নেসলের এই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত খাদ্য শিল্পে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।