মার্কিন রাজনীতিতে নাটকীয় উত্থানের পথে মামদানী, আগাম নির্বাচনে বড় জয়
মার্কিন রাজনীতিতে নিজের দাপট বাড়িয়েই চলেছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানী। হাসিখুশি-উজ্বল চেহারার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মামদানিকে শুরুতে মার্কিন রাজনীতিতে কেউ তেমন একটা ‘হুমকি’ না ভাবলেও দলের ভেতরে তার ক্রমাগত বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে খোদ ডেমোক্রেটদের বর্ষীয়ান নেতাদের একাংশ। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) অনুষ্ঠিত নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আগাম নির্বাচনে তার তিন সহচর বড় ব্যবধানে জয় লাভ করায় মামদানীর নাটকীয় উত্থানকে আমলে না নিয়ে কোনো উপায় নেই তাদের সামনে। খবর রয়টার্সের
এই নির্বাচনে মামদানী সমর্থিত নিউ ইয়র্কের সাবেক সিটি কমপট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডার দুই মেয়াদের কংগ্রেস সদস্য ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করেছেন। অন্য একটি উন্মুক্ত কংগ্রেসনাল আসনে অ্যাসেম্বলি মেম্বার ক্লেয়ার ভালদেস হারিয়েছেন ব্রুকলিন বরো প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও রেনোসোকে। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছেন সমাজকর্মী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার; তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা এবং কংগ্রেসনাল হিস্পানিক ককাসের চেয়ারম্যান, পাঁচ মেয়াদের কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এস্পাইলাতকে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।
২০২৫ সালের নির্বাচনে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়ে পুরো রাজনৈতিক বিশ্বকে চমকে দেওয়া জোরান মামদানীর জন্য এই ফলাফলকে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করার বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিউইয়র্কের এই জোড়া সাফল্যের আগে ওয়াশিংটন ডিসি-র মেয়র পদের প্রাইমারিতেও ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট প্রার্থী জয়ী হয়েছেন এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে রান-অফ বা চূড়ান্ত লড়াইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টদের এই অগ্রযাত্রার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মূলত ২০১৬ সালে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান জোয়ারটি এসেছে মূলত দুটি কারণে—সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও শাসনপদ্ধতির প্রতি প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট ভোটারদের ক্ষোভ এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধনীতিতে বাইডেন প্রশাসনের একাধিপত্য ও সমর্থন। উল্লেখ্য, হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের এই পাল্টা অভিযানে এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য স্টিভ ইসরায়েল এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘রাজনীতি মূলত প্রতিক্রিয়াশীল। উগ্র ডানপন্থার শক্তি যেমন উগ্র বামপন্থাকে উস্কে দেয়, এখানেও ঠিক তা-ই হচ্ছে।’
মামদানীর এই উত্থান ডেমোক্রেটিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য এক বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটিক লিডার হাকিম জেফরিস দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে গত বছর নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে মামদানীকে সমর্থন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, সিনেট ডেমোক্র্যাট লিডার চাক শুমার পুরো প্রচারণায় সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন।
আগামী নভেম্বরের মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে হাকিম জেফরিস প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পদের প্রধান দাবিদার। কিন্তু দলের এই জয়ের পথ নিউইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ‘ডিপ ব্লু’ (নিশ্চিত ডেমোক্র্যাট) আসনগুলোর ওপর নির্ভর করে না; বরং ‘পার্পল’ বা সুইং স্টেট (দোদুল্যমান আসন)-এ রিপাবলিকানদের হারানোর ওপর নির্ভর করে।
মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট কনসালটেন্সি ‘থার্ড ওয়ে’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ম্যাট বেনেট মনে করেন, হিস্পানিক ককাসের চেয়ারম্যানকে একজন ডিএসএ (ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা) সদস্যের হারিয়ে দেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এটি জেফরিসের জন্য জাতীয় রাজনীতিতে সমীকরণ জটিল করে তুলবে।
নবনির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক প্রার্থী আভিলা শেভালিয়ারের অতীত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্ট ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। অতীতে তিনি পুলিশ বাহিনী ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। যদিও তিনি পরে সেসব পোস্ট মুছে ক্ষমা চেয়েছেন, তবুও এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “অভিবাসীদের ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করার কোনো প্রক্রিয়াই সিস্টেমে থাকা উচিত নয়, কারণ এটি বর্ণবাদী মতাদর্শ থেকে তৈরি।”
ম্যাট বেনেট এবং স্টিভ ইসরায়েল উভয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, রিপাবলিকানরা প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ আসনগুলোতে অন্য সাধারণ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ঘায়েল করতে এই চরমপন্থী বক্তব্যগুলোকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করবে। নিউইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ার সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে যদি পুরো দেশের ডেমোক্র্যাটদের মূল ভাবধারা মনে করা হয়, তবে তা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তবে বার্নি স্যান্ডার্সের ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারণার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং প্রগতিশীল কৌশলবিদ অ্যালেক্স জাকুয়েজ বলেন, ‘মূল বিভাজনটা এখানেই—আপনি কি দেশের ধনকুবের, করপোরেট জায়ান্ট এবং স্থিতাবস্থার (স্ট্যাটাস কো) বিরুদ্ধে গিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত, নাকি নন? ভোটারদের মাঝে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ অনেক গভীর, যা ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টদের জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখছে।’