পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অ্যান্ডি বার্নহাম: কে এই রাজনীতিক?
পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে যার নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে তিনি হলেন অ্যান্ডি বার্নহাম। কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ এবং মেকারফিল্ডের নতুন এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর লেবার পার্টির অনেক এমপি বার্নহামের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি তিনি নিশ্চিত করেছেন যে তিনি নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেবেন। এ রাজনীতিক একসময় লেবার পার্টির নেতৃত্ব দখলের চেষ্টা করলেও দু’বারই ব্যর্থ হন। তবে এবার তার সামনে সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
তার অবস্থান আরও শক্ত হয় ওয়েস স্ট্রিটিং এর সমর্থন পাওয়ার পর, যিনি নিজেও নেতৃত্বের দৌড়ে নামার কথা ভাবছিলেন। ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছানোর পথে বার্নহামের প্রথম বড় বাধা কাটে গত সপ্তাহে, যখন তিনি মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জয়ী হন। সেখানে রিফর্ম ইউকে দ্বিতীয় হলেও লেবারের চেয়ে ৯ হাজারেরও বেশি ভোটে পিছিয়ে ছিল। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র হিসেবে তিনি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ৪৫ শতাংশ ভোটকে প্রায় ৫৫ শতাংশে উন্নীত করেন। ২০০১ সালের পর আবার এমপি হিসেবে সংসদে ফিরতে যাওয়া এই রাজনীতিক সোমবার বিকেলে শপথ নেবেন।
বার্নহাম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭০ সালে লিভারপুলে। বড় হন চেশায়ারের ওয়ারিংটনের কাছের কালচেথ এলাকায়। তার বাবা বিটি’র প্রকৌশলী এবং মা জিপি রিসেপশনিস্ট ছিলেন। পরিবারটি ছিল লেবার সমর্থক, যা তার রাজনীতিতে আগ্রহ তৈরি করে। বিবিসির টিভি নাটক বয়েজ ফ্রম দ্যা ব্যাকস্টাফ দেখে মাত্র ১৪ বছর বয়সে লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা পান তিনি, যা লিভারপুলের বেকার জীবন নিয়ে নির্মিত।
আজীবন সমর্থক হিসেবে তিনি ইংলিশ ফুটবল ক্লাব এভারটনের ভক্ত। বন্ধুদের মতে তিনি প্রতিযোগিতামূলক ও খেলাপ্রেমী ছিলেন, ল্যাঙ্কাশায়ারের স্কুল ক্রিকেট দলে দ্রুতগতির বোলার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। স্কুল পর্যায়ে তিনি মক নির্বাচনে লেবার প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয় পান। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে পড়াশোনা করেন। নিজের বই হেড নর্থ-এ বার্নহাম লেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘নিজেকে সম্পূর্ণভাবে খাপ খাওয়াতে পারেননি’ এবং নিজেকে ‘ ভানকারী’ বলে মনে হতো। তবে ম্যানচেস্টারের ইন্ডি সংগীত সংস্কৃতি—বিশেষ করে দ্য স্মিথস ও দ্য স্টোন রোজেসের মতো ব্যান্ড—তাকে পরিচয়ের নতুন ভিত্তি দেয়।
স্নাতক শেষে তিনি সাংবাদিকতায় কাজ করেন, বিভিন্ন ট্রেড ম্যাগাজিনে যুক্ত ছিলেন। পরে টেসা জোয়েলের গবেষক হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্রিস স্মিথের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ২০০১ সালে তিনি নিজের এলাকা লেই থেকে এমপি নির্বাচিত হন। টনি ব্লেয়ার ও পরে গর্ডন ব্রাউনের অধীনে তিনি জুনিয়র মন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯৮৯ সালের হিলসবোরো দুর্ঘটনার ২০তম বার্ষিকীতে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি প্রতিবাদের মুখে পড়েন। ওই ঘটনায় ৯৭ জন লিভারপুল সমর্থক নিহত হন।
২০১৭ সালে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টরের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন এবং ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পান। ২০২১ সালে আরও বড় ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি ক্যাবিনেটে তোলেন, যা দ্বিতীয় দফা তদন্ত শুরুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ২০১০ সালে লেবার পরাজয়ের পর নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হন। ২০১৫ সালে আবার চেষ্টা করলে তিনি জেরেমি করবিন–এর কাছে পরাজিত হন।
সমালোচকদের মতে, তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তন করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গণভোটে তিনি রিমেইন পক্ষে ছিলেন এবং ভবিষ্যতে পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন। তবে মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের সময় তিনি এ বিষয়টি প্রচার থেকে বিরত থাকেন, কারণ এলাকা ব্রেক্সিটপন্থী ছিল।
আরও পড়ুন : গত এক দশকে ছয় প্রধানমন্ত্রী, কেন অস্থির ব্রিটিশ রাজনীতি?
করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় তিনি ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, যদিও তাকে ব্লেয়ারপন্থী মধ্য-ডানপন্থী হিসেবে দেখা হতো। সময়ের সঙ্গে তার অবস্থান বাম দিকে সরে যায় এবং তিনি পানি ও জ্বালানি খাত রাষ্ট্রায়ত্ত করার পক্ষে অবস্থান নেন। মেয়র হিসেবে তিনি পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার করেন, বাস সার্ভিস পুনরায় জননিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বি নেটওয়ার্ক নামে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা চালু করেন। ২০২০ সালের মধ্যে রাস্তায় ঘুমানো মানুষের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ হয়নি। কোভিড মহামারির সময় উত্তর ইংল্যান্ডকে অবহেলার অভিযোগ তুলে তিনি আলোচনায় আসেন, যেখান থেকে তাঁকে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ বলা হয়।
২০২৫ সালের শরৎকালে তিনি নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দেন। তবে বন্ড মার্কেট প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েন। জানুয়ারিতে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের এমপি অ্যান্ড্রু গুইন পদত্যাগ করলে তাঁর সংসদে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে লেবারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাঁকে উপনির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেয়। পরে মে মাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়, লেবারের খারাপ ফল ও রিফর্ম পার্টির উত্থানের পর নেতৃত্ব সংকট তীব্র হয়। এরপর জশ সাইমন্স মেকারফিল্ডের এমপি পদ ছাড়েন, যাতে বার্নহাম সংসদে ফিরতে পারেন। তিনি ওই আসনের লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন এবং পরবর্তী সময়ে পুনরায় ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে আসেন। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।