১৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৩

বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে জামিন চাইলে কী হতে পারে?

বেনজীর আহমেদ  © সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় তাকে কীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তাকে দেশে ফেরানো হবে কি না, সেটি মূলত আদালতের সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক তৎপরতা, আইনি নথিপত্র এবং দুই দেশের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ-এর সাবেক অ্যাসোসিয়েট এডিটর এবং দ্য অ্যারাবিয়ান পোস্ট-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর সাইফুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, দেশটিতে সরকারি ছুটি শেষে মঙ্গলবার থেকে আদালত ও সরকারি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে বেনজীর আহমেদকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি জামিনের আবেদন করতে পারেন।

সাইফুর রহমান বলেন, বেনজীর আহমেদের আইনজীবীরা সম্ভবত আদালতে জামিনের জন্য আবেদন করবেন। আদালত চাইলে তার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা অনুরূপ কোনো শর্ত আরোপ করে তাকে দেশটির ভেতরেই অবস্থান করতে দিতে পারে। বাংলাদেশের পরবর্তী কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের ওপরই তার ভাগ্য অনেকাংশে নির্ভর করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি জানান, আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে পাবলিক প্রসিকিউশনের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। তবে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাইফুর রহমান আরও দাবি করেন, বেনজীর আহমেদকে দুবাই বিমানবন্দর থেকে নয়, বরং দুবাই মল থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি দুবাইয়ের বাসিন্দা হিসেবেও সেখানে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন বিনিয়োগকারী হিসেবেও পরিচিত। তিনি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি ‘গোল্ড কার্ড’ বা ১০ বছর মেয়াদি রেসিডেন্সি সুবিধা পেয়েছেন কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য না থাকলেও এ ধরনের বিনিয়োগকারীদের এমন সুবিধা দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ কিংবা বেনজীর আহমেদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওলোরা আফরিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ইউএই-এর প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও দেশটির আদালত নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়।

তিনি বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়; এটি কেবল একটি নোটিশ। আদালত প্রথমে দেখবে, বাংলাদেশে যে অপরাধের অভিযোগে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে, সেই অভিযোগ ইউএই আইন অনুযায়ীও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় কি না।

আইনজীবী আফরিন আরও বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাকি প্রকৃত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটিও আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

তিনি জানান, বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে বাংলাদেশকে ইউএই আদালতে গ্রেফতারি পরোয়ানার কপি, মামলার নথি, অপরাধসংক্রান্ত প্রমাণাদি এবং বাংলাদেশের আদালতের আদেশসহ প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র জমা দিতে হবে। আদালত এরপর যাচাই করবে, আইনি প্রক্রিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং ইউএই-এর আইন অনুযায়ী নথিগুলো গ্রহণযোগ্য কি না।

আইনজীবী আফরিনের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ইউএই আদালতের ওপর নির্ভর করবে।

বর্তমানে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং আরেকটি মামলার বিচার চলছে। এছাড়া পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ আরও পাঁচটি মামলার তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার তদন্ত চলছে।

ওলোরা আফরিন বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে আইনি ও কূটনৈতিক—দুই ধরনের প্রচেষ্টাই একসঙ্গে চালাতে হবে। তার মতে, কূটনৈতিক চ্যানেলই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রায় ৩০ দিনের মতো সময় লাগতে পারে।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই মামলার পাশাপাশি পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলার কারণেও ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল।

তিনি বলেন, এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় রিকোয়েস্ট লেটার ও সংশ্লিষ্ট সব নথি পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যথাযথ কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হবে।

আকতারুল ইসলাম জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সহায়তায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর পথ সহজ নাও হতে পারে। সাইফুর রহমান বলেন, যদি তিনি ইউএই-এর বৈধ বাসিন্দা এবং সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ না থাকে, তাহলে তার আইনজীবীরা এই বিষয়টি আদালতে তুলে ধরতে পারেন।

অন্যদিকে ওলোরা আফরিন মনে করেন, শুধু বিনিয়োগকারী হওয়া বা রেসিডেন্ট মর্যাদা থাকা কাউকে আইনি সুরক্ষা দেয় না। বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।

তিনি ২০২৩ সালে ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানের উদাহরণ তুলে ধরেন। ভারতীয় পাসপোর্ট থাকার কারণে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। একইভাবে বেনজীর আহমেদের অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকলে ইউএই আদালত সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোকেও বিবেচনায় নিতে পারে।

এরই মধ্যে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদ অধিবেশনের আগে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা ইতোমধ্যে পুলিশের এনসিবির কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারপোলের কাছেও পরোয়ানার কপি পাঠানো হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যমান সব গ্রেফতারি পরোয়ানা সংযুক্ত করে ইউএই সরকারের কাছে বেনজীর আহমেদকে ফেরত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয় থেকে সাতটি মামলার তদন্তও চলমান রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, ইউএই-এর আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী কোনো প্রত্যর্পণ আবেদন করা হলে তা প্রথমে দেশটির প্রসিকিউটরের কাছে যায়। এরপর প্রসিকিউটর বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করেন এবং আদালতের অনুমোদনের পরই কোনো আসামিকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও থাইল্যান্ডের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সরাসরি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও ‘সিকিউরিটি কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ এবং ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ট্রান্সফার অব সেনটেন্সড পারসনস’ নামে দুটি চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে।

এই চুক্তির আওতায় অতীতেও আসামি দেশে ফেরানোর নজির রয়েছে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি মহসিন মিয়াকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। একই মামলার প্রধান আসামি আরিফ সরকারকেও গত ৬ মে দুবাই থেকে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশ পুলিশ।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের আব্রাহাম খান হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোবারক মণ্ডলকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে শনাক্ত করে কাতার থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তবে ইন্টারপোলের প্রকাশ্য রেড নোটিশ তালিকায় এখন পর্যন্ত বেনজীর আহমেদের নাম দেখা যায়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের ৫৯ জন নাগরিকের নাম ওই তালিকায় রয়েছে। অতীতে বাংলাদেশের আবেদনে বিভিন্ন হত্যা মামলা, শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।