যুদ্ধ আপাতত থামলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখনো ‘অস্পষ্ট’: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানামুখী সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে এবং শিপিং কোম্পানিগুলোর আস্থা ফিরতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর পাশাপাশি চুক্তির বেশ কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
গত সোমবার (১৫ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে এই চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ এখনও জনসমক্ষে আনা হয়নি। একই সঙ্গে উভয় দেশই স্পষ্ট করেছে যে, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত আলোচনা ও সমঝোতা বাকি রয়েছে।
এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির আওতায় গত এপ্রিল মাসে ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে। পাশাপাশি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান কার্যত এই জলপথটি অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।
৬০ দিনের এই সময়সীমার মধ্যে আলোচনার পরবর্তী ধাপে উভয় পক্ষের কূটনীতিকরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যতের মতো জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে যুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রমাণে ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন—অর্থাৎ আঞ্চলিক সশস্ত্র প্রক্সি বা মিলিশিয়াদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ—সেগুলো এই আলোচনার এজেন্ডায় নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘চুক্তিটি পুরোপুরি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত থাকবেন।’
চুক্তির খবরের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম গত ১০ মার্চের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) এশিয়ার বাণিজ্যিক সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস ০.৩% কমে প্রতি ব্যারেল ৮২.৯৬ ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
এই যুদ্ধ এখন পর্যন্ত ইরান ও লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে অন্তত ৭,০০০ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বিপর্যস্ত করেছে। সেই তুলনায় এই চুক্তিটিকে সংকট সমাধানের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গতকাল সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, অন্তর্বর্তী চুক্তিটি যুদ্ধ থামানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তি এখনও রূপ নেয়নি।
এদিকে জাপানের অন্যতম বৃহৎ শিপিং জায়ান্ট মিতসুই ওএসকে লাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাকেশি তামোরা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, এই চুক্তিটি কতটা কার্যকর বা বাস্তবসম্মত তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিপিং কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তাদের জাহাজ পাঠাবে না। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতার আলোতে এটা বলাই বাহুল্য যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ বা এক মাস সময় লাগতে পারে’- যোগ করেন তিনি।
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তির ফলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্তকরণ এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনাকারী প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সুবিধা পেতে হলে ইরানকে কখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধ করার মার্কিন শর্ত পূরণ করতে হবে। তবে ইরান বরাবরের মতোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিপ্রায় অস্বীকার করে আসছে।
চুক্তির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে লেবাননে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াদের মধ্যকার লড়াই, যার ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইরান স্পষ্ট করেছে যে, চুক্তির কার্যকারিতার জন্য লেবাননে সম্পূর্ণ বৈরিতা অবসান জরুরি। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তাদের সেনা মোতায়েন রাখবে এবং হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের থাকবে। তিনি বলেন, ‘ইরান চেয়েছিল আমরা যেন পিছু হটি, কিন্তু আমি আমার অবস্থানে অনড় ছিলাম।’
উল্লেখ্য, ইসরায়েল এই শান্তি আলোচনায় সরাসরি অংশ নেয়নি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মার্চে হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়ানোর পর ইসরায়েল লেবাননে যে আগ্রাসন শুরু করেছিল, তা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা এই চুক্তির কোনো শর্ত ছিল না। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলি হামলা অবিলম্বে বন্ধ হতে হবে।