১৫ জুন ২০২৬, ০৭:৫৫

যুদ্ধবিরতির চুক্তি ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের, স্বাক্ষর শুক্রবার

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান  © সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

রবিবার (১৪ জুন) যুক্তরাষ্ট্র সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে।’ এর কিছুক্ষণ আগেই মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে চুক্তির বিষয়টি জানান। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে শাহবাজ শরিফ জানান, এই সমঝোতার আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।

ট্রাম্প বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি, যা কয়েক মাস ধরে কার্যত বন্ধ ছিল, তা পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও প্রত্যাহার করা হবে। ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, ‘বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহ শুরু হোক।’

তবে পরে তিনি আরেকটি পোস্টে স্পষ্ট করেন, হরমুজ প্রণালি তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং আগামী ১৯ জুন চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খুলে দেওয়া হবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও একই তারিখে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের কথা জানিয়েছেন।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতারের একটি প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করতে ১৭ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে তেহরান ত্যাগ করেছে। প্রতিনিধি দলটি এখন দোহায় ফিরছে এবং আগামী সপ্তাহে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতিমূলক বৈঠকও কাতারের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শিগগিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। পরে ট্রাম্পের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই জল্পনার অবসান ঘটে।

রয়টার্সের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, খসড়া চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হবে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও ৬০ দিনের আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতে ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালায় এবং কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করে। তবে ইসরায়েল জানিয়েছে, প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির কোনো পক্ষ তারা নয়।

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইরান যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান দলের জন্য চাপের কারণ হয়ে উঠেছিল। জনমত জরিপে দেখা গেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার প্রাক্কালে রোববার লেবাননে ইসরায়েলের একটি হামলা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ইসরায়েল দাবি করেছে, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘বৈরুতে সর্বশেষ হামলা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা ও সক্ষমতা রাখে না।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে এবং ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, ‘শত্রুর হৃদয়ে আঘাত হানার জন্য আঙুল ট্রিগারে রয়েছে।’ অন্যদিকে ট্রাম্পও হামলার সমালোচনা করে বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির এত কাছাকাছি অবস্থানে থাকা অবস্থায় আজ সকালের বৈরুত হামলা হওয়া উচিত ছিল না।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে লেবানন ইস্যুতে ট্রাম্পের মতপার্থক্য রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় লেবাননে সামরিক তৎপরতা সীমিত করা হোক, যাতে ইরানের সঙ্গে চুক্তি এগিয়ে নেওয়া যায়।

ফক্স নিউজের বরাত দিয়ে বলা হয়, আলোচনায় সংশ্লিষ্ট এক কূটনীতিকের মতে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রচেষ্টাকে জটিল করেছে এবং এটি শান্তি উদ্যোগকে নস্যাৎ করার একটি চেষ্টা হতে পারে। রবিবার ট্রাম্প টেলিফোনে নেতানিয়াহুকে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কেও অবহিত করেছেন বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এন-১২ জানিয়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, খসড়া চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ২৫ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করে দিতে সম্মত হয়েছে। বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বৃদ্ধি করবে না এবং নতুন পারমাণবিক স্থাপনা সম্প্রসারণও করবে না।

অন্যদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তির ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হবে এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী ইরান দেশের ভেতরেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করার সুযোগ পাবে।

চুক্তি চূড়ান্ত করতে কাতারের আলোচকরা রোববার সকালে তেহরানে যান বলেও রয়টার্সকে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে ইরানে শনিবার রাতে সরকার-সমর্থিত সমাবেশগুলোতে এই সমঝোতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, কঠোর অবস্থানপন্থীরা চুক্তির বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করেছেন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানান, কিছু বিক্ষোভকারী “সমঝোতাকারীর মৃত্যু হোক” স্লোগান দিয়েছেন, যা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির প্রতি ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।

চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারাও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস সমঝোতা স্মারককে সতর্ক আশাবাদের সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ছিল ট্রাম্পের এবং এর ফলে মার্কিন নাগরিক, মিত্র দেশ, বৈশ্বিক বাজার ও অসংখ্য নিরীহ মানুষের ওপর বাস্তব ক্ষতি নেমে এসেছে।

মিকসের মতে, ‘আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত এবং যাচাইযোগ্য চুক্তিই ইরান-সংক্রান্ত বিরোধ টেকসইভাবে সমাধানের একমাত্র উপায়।’

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ কখনোই ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারেনি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি বন্ধ করতে পারেনি, আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন থামাতে পারেনি কিংবা ইরানি জনগণের প্রতি নিপীড়নের অবসান ঘটাতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তি অবশ্যই টেকসই, কার্যকর, স্বচ্ছ এবং কংগ্রেসের কঠোর তদারকির আওতায় থাকতে হবে।