ইরান-আফগানিস্তানসহ ৪ দেশের অভিবাসীদের আফ্রিকায় পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক ও জর্জিয়ার নাগরিকদের একটি বিশেষ বিমানে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে (সিএআর) পাঠানো হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক পাঠানো এই অভিবাসীদের অনেকেরই যুক্তরাষ্ট্রে আইনি সুরক্ষা ছিল, তবুও তাদের এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পাঠানো হয়েছে যার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই।
অথচ খোদ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিজেই মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে সর্বোচ্চ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে সেখানে নাগরিকদের ভ্রমণ এড়ানোর পরামর্শ দিয়ে রেখেছে। চরম অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ এই গন্তব্যে ৪ দেশের অভিবাসন প্রত্যাশীদের পাঠানোর ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, এই ফ্লাইটে অন্তত দুজন ইরানি নারী ছিলেন যারা ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চেয়েছিলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রে ‘উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল’ বা বহিষ্কারাদেশ স্থগিতকরণ নামের একটি আইনি সুরক্ষা পেয়েছিলেন, যার আওতায় কাউকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার নির্যাতনের ঝুঁকি রয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ হলেও অন্য কোনো ‘তৃতীয় দেশে’ পাঠানোর ক্ষেত্রে আইনি বাধা নেই। তবে অভিবাসীদের আইনজীবী এমিলি ট্রোস্টল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন যে, শেষ পর্যন্ত এই মানুষদের আবার সেই দেশগুলোতেই ফিরে যেতে বাধ্য করা হতে পারে যেখান থেকে তারা প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছিলেন, কারণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাঠানো অন্যান্য বহিষ্কৃতদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ফার্স্ট’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘আইসিই ফ্লাইট মনিটর’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের আলেকজান্দ্রিয়া শহর থেকে যাত্রা শুরু করে। এরপর শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে ঘানায় নির্ধারিত যাত্রাবিরতি করার পর গ্রিনিচ সময় রাত ৯টার দিকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাংগিতে পৌঁছায়।
অভিবাসন আইনজীবী আলমা ডেভিড জানান, ঘানায় কিছু যাত্রীকে নামানো হয়েছে কি না, নাকি সবাইকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়েছে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। ঘানা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘তৃতীয় দেশে বহিষ্কার কার্যক্রমের’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, রুয়ান্ডার সেনা এবং রাশিয়ার ভাড়াটে বাহিনী ‘ওয়াগনার গ্রুপ’-এর উপস্থিতির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকারবিরোধী যোদ্ধাদের তৎপরতা রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা বহিষ্কার-সংক্রান্ত গোপন চুক্তির মধ্যে বাংগির সঙ্গে এটিই প্রথম। দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের নেতা পল ক্রিসেন্ট বেনিংগা জানান, এসব অভিবাসী সেখানে সাময়িকভাবে থাকবেন নাকি আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের কর্তৃপক্ষও এই চুক্তির বিস্তারিত নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এর আগে ঘানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আটকে রাখা এবং ইসওয়াতিনিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অভিবাসীদের আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ঘানা ও বিষুবীয় গিনি থেকে কিছু মানুষকে এমন দেশেও ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেখানে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে বলে মার্কিন আদালত আগে মত দিয়েছিল। এসব মানুষের কোনো আইনি মর্যাদা, পরিচিতজন বা সহায়তা ব্যবস্থা ছাড়াই চরম ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে।
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে আফ্রিকার সর্বোচ্চ মানবাধিকার সংস্থা ‘আফ্রিকান কমিশন অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস’-এ একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে বিষুবীয় গিনিতে মার্কিন বহিষ্কার কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানানোর পাশাপাশি অভিবাসীদের যাতে জোর করে নিজ দেশে ফেরত না পাঠানো হয়, সেই ব্যবস্থাও চাওয়া হয়েছে।