সীমান্তের শূন্য রেখায় রাত কাটাচ্ছেন দেড় বছরের শিশুসহ ১২ জন
জন্মই যেন আজন্ম পাপ! ছোটবেলা থেকে যে পরিবেশের আলো-বাতাসে বড় হয়েছেন একদিন তারা হুট করেই নিজেদের আবিষ্কার করেন ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে। কয়েক দশকের নিজ জন্মভূমি ছেড়ে তাদেরকে রাত পার করতে হচ্ছে দেশান্তরী হিসেবে। তাও আবার আন্তর্জাতিক সীমানা রেখার জিরো লাইনে। শুনতে অনেকটা হলিউড মুভির কোনো দৃশ্যপটেরর অবয়ব চোখের সামনে ভেসে উঠলেও, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর এটাই যেন নিয়তি ভারতের সীমান্তবর্তী মানুষদের।
সেভাবেই সীমান্তের কাটা তারের মাঝখানে ঠাঁই হয়েছে বিএসএফের পুশইনের শিকার ১২ ভারতীয়ের। কুষ্টিয়ার দৌলতপরে প্রাগপুর সীমান্তে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী ও শিশুসহ ১২ জন চরম প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গতকাল শুক্রবার (১২ জুন) ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান না হওয়ায় ওই ১২ জনকে আজ শনিবারও সীমান্তের শূন্যরেখাতেই অবস্থান করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রাগপুর সীমান্তের ৪৮ নম্বর মেইন পিলার সংলগ্ন শূন্যরেখায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১২ জনের দলটি একটি ফসলি জমিতে বসে আছেন। প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটানো এই মানুষদের মানবিক দিক বিবেচনা করে স্থানীয় বাংলাদেশিরা মাঝেমধ্যে খাবার ও পানি নিয়ে মাথাভাঙ্গা নদীর ওপরের সাঁকো পার হয়ে সেখানে পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে চরম অনিশ্চয়তা আর বিএসএফের নতুন করে নির্যাতনের আতঙ্কে কাটছে তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আটকে পড়া ওই ১২ জনের মধ্যে ৪ জন নারী, ৪ জন পুরুষ এবং ৪ জন শিশু রয়েছে। শিশুদের মধ্যে একজনের বয়স মাত্র এক থেকে দেড় বছর। শুক্রবার ভোরে বিএসএফের তাড়া খেয়ে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা বিষয়টি টের পেয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-কে খবর দেন। পরে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় তাঁদের সীমান্তের শূন্যরেখায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এই জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে গতকালই বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একটি কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে বিএসএফের অনীহার কারণে শেষ পর্যন্ত তা অনুষ্ঠিত হয়নি। শনিবার (১৩ জুন) দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিবি-৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আজ শনিবার পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এর আগ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই ১২ জনকে সীমান্তের শূন্যরেখাতেই থাকতে হচ্ছে।’
এদিকে প্রাগপুর সীমান্তের এই ঘটনার পর গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে দৌলতপুর সীমান্তের ধর্মদহসহ আরও কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে নতুন করে পুশ-ইনের চেষ্টা চালাচ্ছে বিএসএফ। তবে বিজিবি এবং স্থানীয় সীমান্তবাসীর কড়া পাহারার মুখে তারা সফল হতে পারছে না।
বিজিবির আশঙ্কা, রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে বিএসএফ পুশ-ইনের জন্য আরও জোর প্রচেষ্টা চালাতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে পুরো দৌলতপুর সীমান্তজুড়ে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের যৌথ নজরদারি এবং সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা (অ্যালার্ট) বজায় রাখা হয়েছে।