১১ জুন ২০২৬, ০৭:২১

দুই দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরানের হামলা   © সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে তেহরান।

ইরানের দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায়। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে থাকা দুটি জাহাজেও আঘাত হানার দাবি করেছে দেশটি।

বুধবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ‘অযৌক্তিক ও অব্যাহত আগ্রাসনের’ জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও সিরিক শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় কারগান শহরেও বিস্ফোরণ হয়েছে, যেখানে অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এপ্রিল মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। একই সঙ্গে তারা ঘোষণা দেয়, হরমুজ প্রণালি ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ বন্ধ থাকবে।

আইআরজিসি জানায়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজ এ সিদ্ধান্তের প্রভাবে পড়বে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সেই দাবিও প্রত্যাখ্যান করে, যেখানে ওয়াশিংটন বলেছিল যে তারা জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সহায়তা করেছে।

পরে আইআরজিসি আরও জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘অবৈধভাবে’ চলাচলের চেষ্টা করা দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল সালেম ও আহমাদ আল-জাবের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবিও করে তারা।

এই উত্তেজনা শুরু হয় একদিন আগে হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায়। পরে হেলিকপ্টারের দুই পাইলটকে সমুদ্রপথ থেকে উদ্ধার করা হয়।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘খুব কঠোর’ পদক্ষেপ নেবে।

তিনি বলেন, “চুক্তির বিষয়ে কী হয়, তা আমরা দেখব। আমরা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি ছিলাম। কিন্তু তারা বারবার সময়ক্ষেপণ করছে। তারা আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছে।”

এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ইরান শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনায় অনেক বেশি সময় নিচ্ছে এবং এখন তাদের এর মূল্য দিতে হবে।

পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও হুমকি দেন যে, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে সই করতে রাজি না হয়, তাহলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতেও হামলা চালানো হতে পারে।

ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

তিনি লেখেন, “গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একটি দেশের মানুষের জীবনরেখা। পরিবহন নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ ও পানিসেবা খাতকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং এটি একটি জাতির দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির সামনে অসহায়ত্বের প্রকাশ।”

তিনি আরও বলেন, “নিজেদের বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান, সক্ষমতা, জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ওপর ভর করে ইরান যেকোনো চাপ ও হুমকির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে।”

এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে কয়েক দিন আগে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর। এপ্রিল মাসের যুদ্ধবিরতির পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সংঘাত। ওই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণের অবসান হয়েছিল।

তবে শান্তিচুক্তির পথে অগ্রগতি এখনও ধীরগতির। দুই দেশ বর্তমানে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। আলোচনার লক্ষ্য হলো একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছানো, যার মাধ্যমে সংঘাত বন্ধ থাকবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়া হবে।

তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইরান চায় তাদের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা হোক এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হোক।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান।

ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননের সংঘাতও বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইসরায়েল দাবি করছে, লেবাননের যুদ্ধ একটি আলাদা সংঘাত এবং সেটিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না।