০৬ জুন ২০২৬, ১৭:৫২

ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ডাটা সেন্টারের উদ্যোক্তা এই বাংলাদেশি তরুণের সঙ্গে পরিচিত হোন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এয়ারট্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সিইও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রবিন খুদা   © সংগৃহীত

ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড অবকাঠামো খাতের অভূতপূর্ব জোয়ারে শামিল হতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের বিনিয়োগের একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এশিয়া-প্যাসিফিকের শীর্ষস্থানীয় হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারট্রাংক’ । বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের আর্থিক সমর্থনে ভারতে ৫ গিগাবাইটেরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টার অবকাঠামো গড়ে তোলাই এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। বহুজাতিক এই ঐতিহাসিক বিনিয়োগের নেপথ্যে রয়েছেন এয়ারট্রাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রবিন খুদা।

ফোর্বসের তথ্যমতে ২০২৩ সালে 'অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ' কর্তৃক বছরের সেরা ব্যবসায়ী নির্বাচিত হওয়া এই বিলিয়নেয়ারের বর্তমান নিট সম্পদের পরিমাণ ২১০ কোটি ডলার, যার সিংহভাগই তিনি ডেটা সেন্টার নির্মাণের মাধ্যমে অর্জন করেছেন। ভারতের ইতিহাসে ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে এটি অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগ প্রস্তাব, অন্যটি দেশটির স্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের, যেখানে পরিবেশবান্ধব ডেটা সেন্টারে ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে তারা।

চলতি বছরেরএপ্রিলে ‘লুমিনা ক্লাউডইনফ্রা’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করার মাধ্যমে ভারতে এয়ারট্রাংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়, যা তাদের মুম্বাই, চেন্নাই এবং হায়দরাবাদে প্রাথমিক ৬০০ মেগাওয়াটের একটি উন্নয়ন প্রকল্প এনে দেয়। নতুন এই মহাপরিকল্পনার আওতায় ভারতের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রকল্প বিস্তৃত হবে। 

ইতোমধ্যে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাদনবিস জানিয়েছেন, রায়গড় পেন গ্রোথ সেন্টারে একটি প্রস্তাবিত ৩ গিগাওয়াট ডেটা সেন্টার প্রকল্পের জন্য ভূমি বরাদ্দের লেটার অব ইনটেন্ট বিনিময় হয়েছে, যেখানে প্রায় ২ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ করা হবে। 

এয়ারট্রাংক জানিয়েছে, ভারতের ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’, ‘ইন্ডিয়া-এআই মিশন’ এবং ‘ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন’-এর মতো ইতিবাচক সরকারি নীতিমালার কারণেই তারা দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য বেছে নিয়েছে। রবিন খুদার মতে, গ্লোবাল ক্যাপিটাল বা পুঁজি সবসময় গতিশীল এবং যে দেশগুলো দ্রুততা ও সমন্বয়ের সাথে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তারাই এআই অবকাঠামো বিনিয়োগের এই পরবর্তী জোয়ারকে লুফে নিতে পারবে।

ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা রবিন খুদা ১৯৯৭ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া যান এবং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ফুজিৎসু অস্ট্রেলিয়া, পাইপ নেটওয়ার্কস এবং নেক্সটডিসি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও টেলিকম প্রতিষ্ঠানে সিএফও এবং কৌশলগত পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে তিনি নিজেই ‘এয়ারট্রাংক’ প্রতিষ্ঠা করেন। 

শুরুর দিকে নিজের জমানো টাকা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলেও ২০১৭ সালের মধ্যেই সিডনি ও মেলবোর্নে বড় ক্যাম্পাস খোলে তার প্রতিষ্ঠান এবং ২০২৪ সালে ব্ল্যাকস্টোন নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম ২,৪০০ কোটি ডলারের এক বিশাল চুক্তিতে এয়ারট্রাংক অধিগ্রহণ করলেও খুদাকেই সিইও হিসেবে বহাল রাখা হয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং সৌদি আরব জুড়ে বিস্তৃত এই গ্লোবাল হাইপারস্কেল প্ল্যাটফর্মটির ভারতে ৩ মুম্বাই, ১ চেন্নাই এবং ১ হায়দরাবাদ প্রজেক্টের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে যাচ্ছে।

এদিকে এয়ারট্রাংকের এই বিশাল বিনিয়োগের ঘোষণাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেশের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের এক দারুণ অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই উদযাপনের বিপরীতে নেটিজেন ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে তীব্র সংশয় ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ঠিক পরদিনই এমন পরিবেশ-সংবেদনশীল প্রকল্পের ঘোষণায় সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

কারণ, ‘কাউন্সিল অব এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার’ এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই বিপুল বিদ্যুৎ ও পানিশোষক ডেটা সেন্টারগুলোর পানির ব্যবহার ৩০০ বিলিয়ন লিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে—যা দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর মারাত্মক বিপর্যয়কর চাপ সৃষ্টি করবে।