০৩ জুন ২০২৬, ২০:৩৮

যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে উঠেছে ইরান

তেহরানের পথে টাঙানো জাতীয় সংহতির ব্যানার  © সংগৃহীত

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে তেহরান তার বহিরাগত প্রতিরোধ কৌশলের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা মতবাদের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে বলে উঠে এসেছে মিডলইস্ট আইয়ের এক নিবন্ধে।

যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে যে জাতীয় সংহতি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়েছে, তা আগ্রাসী দেশগুলোর উন্নত সামরিক প্রযুক্তির সামনে ইরানকে এক বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাতের আগে ইরানের কৌশল মূলত ছিল ‘আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা’, যা লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এবারের যুদ্ধ ইরানকে বুঝিয়েছে যে তাদের হাতে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মতো আরও শক্তিশালী কার্ড রয়েছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে তেহরানের দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম স্তরটি এখন নিজস্ব মূল ভূখণ্ড থেকেই শুরু হচ্ছে এবং আঞ্চলিক মিত্ররা প্রয়োজন অনুযায়ী দ্বিতীয় স্তরে পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। পশ্চিমারা এতদিন দাবি করত যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্ররা কেবলই তেহরানের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার, তবে বর্তমান যুদ্ধে লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি আলোচনায় হিজবুল্লাহর পক্ষে ইরানের শক্ত অবস্থান সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। 

গত সোমবারও ইরান হুমকি দিয়েছে যে ইসরায়েল যদি বৈরুত বা তার দক্ষিণাঞ্চলীয় দাহিয়া শহরতলিতে হামলা চালায়, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে বেরিয়ে যাবে। ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান ও সামরিক প্রতিরোধ মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের ইসরায়েলি আকাঙ্ক্ষাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই সংঘাতের পর ইসরায়েল নয়, বরং ইরানই মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃত ‘আঞ্চলিক পরাশক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেশটির বৈশ্বিক ভূমিকাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

অন্যদিকে, এই যুদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথাগত ‘যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে বিলিয়ন ডলার খরচ করে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে জায়গা দেওয়া এবং অস্ত্র কেনার পরও আরব দেশগুলো দেখেছে যে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিনিরা তাদের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। 

এই নিরাপত্তা সংকটের কারণে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন নতুন ভূ-রাজনৈতিক উভয়সংকটে পড়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে আরব নেতারা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সাথে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর এবং তেহরানকে কিছু ছাড় দেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ দিচ্ছেন। ফলস্বরূপ, স্বল্প মেয়াদে হলেও ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন পরমাণু ইস্যু থেকে সরে গিয়ে তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক ও কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে।