০২ জুন ২০২৬, ২০:১৭

অপরাধের বয়সসীমা ১৩ বছরে নামিয়ে আনছে সুইডেন, তৈরি হচ্ছে ‘শিশু জেলও’

প্রতীকী ছবি  © সংগৃহীত

সুইডেনে গত এক দশকে গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা, বোমা হামলা এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় খুনি শিশুদের শাস্তির আওতায় আনতে ফৌজদারি অপরাধের বয়সসীমা ১৫ থেকে কমিয়ে ১৩ বছর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই বয়সসীমা বেশ কম। পাশাপাশি দেশটিতে তৈরি হচ্ছে শিশু জেলও। খবর রয়টার্সের

নতুন এই আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের সমাজসেবা কেন্দ্রের সাধারণ হেফাজতে না পাঠিয়ে বিশেষ কারাগারে বন্দি রাখা হবে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে অপরাধ দমনকে প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু করে আগামী ১৫ জুন দেশটির পার্লামেন্টে এই বিতর্কিত বিলটির ওপর ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে।

সুইডেনের বিচারমন্ত্রী গুনার স্ট্রোমার গত এপ্রিলে এই পরিস্থিতিকে একটি জরুরি অবস্থা হিসেবে অভিহিত করে জানান, গত বছর ১৫ বছরের কম বয়সী ৫২টি শিশু হত্যা বা হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধের মামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। ফলে চুরি বা ছিনতাই নয়, সরাসরি খুনের মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে অতীতের নরম নীতি আর কার্যকর নয়। 

পুলিশ প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, সুইডেনে বর্তমানে ১৭ হাজার ৫০০ জন সক্রিয় গ্যাং সদস্য এবং ৫০ হাজার সহযোগী রয়েছে, যারা মাদক ব্যবসা, বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতি এবং ডাকাতির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। এই অপরাধী চক্রগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মাত্র ১১ বছর বয়সী শিশুদেরও খুন ও বোমা হামলার মতো জঘন্য কাজে ব্যবহার করছে।

অবশ্য এই নতুন কঠোর দমন নীতির সুফল ইতিমধ্যেই মিলতে শুরু করেছে বলে দাবি করেছে ২০২২ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা দেশটির ডানপন্থী সরকার। ২০২৩ সালে বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা যেখানে ৬২ জন ছিল, ২০২৫ সালে তা কমে ৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং বর্তমানে অনেক বেশি গ্যাং সদস্য কারাবন্দি রয়েছে। 

তবে শিশুদের গ্যাংয়ে যোগ দেওয়া বন্ধ করা এবং এই নতুন আইনের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতা। বিরোধী দল সেন্টার পার্টির মুখপাত্র উইলমা রথ বলেন, ‘১৩ বছরের একটি শিশু যে এখনো আইনগতভাবে এনার্জি ড্রিংকস কেনার বয়সেও পৌঁছায়নি, তাকে সামাজিক পুনর্বাসনে না পাঠিয়ে কারাগারে বন্দি করা কখনোই সঠিক সমাধান হতে পারে না।’

বর্তমানে সুইডেনের রোসার্সবার্গসহ তিনটি কারাগারকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী করে নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে বন্দি শিশুদের পড়ালেখা, খেলাধুলা ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। কারাগারের গভর্নর গ্যাব্রিয়েল ওয়েসম্যান জানান, প্রাপ্তবয়স্ক কয়েদিদের তুলনায় এই কিশোরদের সামলানো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ তাদের অনেকেই এই কারাগারের ভেতরেই বয়ঃসন্ধিকাল পার করবে। 

সুইডেনের জাতীয় অডিট অফিসের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগের নিয়মে তরুণ অপরাধীদের সমাজসেবা কেন্দ্রে পাঠানো হলেও তাদের ৯০ শতাংশই পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ত এবং ৮০ শতাংশই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে স্থায়ী অপরাধী হিসেবে কারাগারে ফিরত। 

ডেনমার্ক ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যেখানে এই বয়সসীমা বাড়ানোর বিতর্ক করছে, সেখানে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফিলিপ এস্ট্রাডা ডরনার মনে করেন, প্রান্তিক শিশুদের আটকে রাখলে তাদের জীবন ধ্বংসের ঝুঁকি থাকে, তবে রাস্তাঘাটে খুনিদের ঘুরে বেড়াতে দিয়ে সমাজকেও ঝুঁকিতে ফেলা যায় না।