পাঁচ বছরে ৩১ লাখ জনসংখ্যা কমেছে জাপানে, নেপথ্যে কী?
জাপানের মোট জনসংখ্যা গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩১ লাখ কমেছে বলে সরকারি তথ্যে উঠে এসেছে। কম জন্মহার ও দ্রুত বার্ধক্যজনিত সংকটের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই জনসংখ্যা হ্রাসের চাপের মুখে রয়েছে।কোরিয়ার আগেই একই ধরনের জনসংখ্যাগত সংকটের মুখোমুখি হওয়া জাপানের এই পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জন্মহার কমে যাওয়া এবং মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা এই পতনের প্রধান কারণ।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও দ্য সিউল টাইমসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য বলা হয়েছে। জাপানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রক কর্তৃক গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘২০২৫ সালের জাতীয় আদমশুমারির প্রাথমিক জনসংখ্যা সারণী’ অনুযায়ী, গত বছরের ১ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশি নাগরিকসহ জাপানের মোট জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৩০ লাখ ৪৯ হাজার ৫২৪ জন (১২৩,০৪৯,৫২৪)।
এ সংখ্যাটি ২০২০ সালের আগের জরিপের তুলনায় ৩০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৫ জন (বা ২.৫ শতাংশ) কম। ২০১৫-২০২০ সালের জরিপে জনসংখ্যা হ্রাসের হার ছিল ০.৭ শতাংশ, সেই তুলনায় এবার জনসংখ্যা কমবার গতি তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০১০ সালের তুলনায়, যখন জাপানের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজারে (১২৮.০৫ মিলিয়ন) পৌঁছেছিল, গত ১৫ বছরে দেশটি প্রায় ৫০ লাখ মানুষ হারিয়েছে।
এর ফলে জাতিসংঘের হিসাবের ওপর ভিত্তি করে জাপানের বৈশ্বিক জনসংখ্যার র্যাংকিং ১১তম থেকে ১২তম স্থানে নেমে গেছে এবং ইথিওপিয়া জাপানকে ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে 'নিহন কেইজাই শিম্বুন'। লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনে দেখা গেছে, পুরুষ ছিল ৫ কোটি ৯৭ লাখ ৭৮ হাজার ৮২৬ জন এবং নারী ছিল ৬ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ৬৯৮ জন। লিঙ্গ অনুপাত (প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা) ছিল ৯৪.৫।
আঞ্চলিক দিক থেকে, দেশের ৪৭টি প্রিফেকচারের (প্রাদেশিক অঞ্চল) মধ্যে ৪৫টিতেই জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে; এর ব্যতিক্রম ছিল কেবল টোকিও (১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং ওকিনাওয়া প্রিফেকচার (০.১ শতাংশ বৃদ্ধি)। টোকিওর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৪৬ হাজার, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১১.৬ শতাংশ। এর অর্থ হলো, জাপানের প্রতি ১০ জন বাসিন্দার মধ্যে প্রায় একজন টোকিওতে বসবাস করেন। এমনকি সাইতামা, চিবা এবং কানাগাওয়া টোকিওকে ঘিরে থাকা বৃহত্তর মেট্রোপলিটন এলাকার এই প্রিফেকচারগুলো, যেগুলোতে আগের জরিপে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল সেগুলোতেও এবার পতন দেখা গেছে, যা টোকিওতে জনসংখ্যার কেন্দ্রীভূতকরণকে আরও তীব্র করেছে।
আরও পড়ুন: চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর ফ্রান্সজুড়ে তাণ্ডব, গ্রেপ্তার চার শতাধিক
জাপানের জাতীয় আদমশুমারি হলো একটি মৌলিক জাতীয় পরিসংখ্যানগত জরিপ, যা বিদেশি নাগরিকসহ জাপানের সমস্ত পরিবারের অবস্থা মূল্যায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ বিষয়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রক কর্তৃক প্রতি পাঁচ বছর পর পর পরিচালিত হয়। এই জরিপের ফলাফল স্থানীয় ট্যাক্স অনুদান গণনা এবং নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণের আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
একই পথের মুখোমুখি কোরিয়া
কম জন্মহার এবং বার্ধক্যের কারণে ২০২০ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়াও জনসংখ্যা হ্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে। কর্মক্ষম জনসংখ্যা সংকুচিত হওয়া এবং আঞ্চলিক সমাজগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। 'স্ট্যাটিস্টিকস কোরিয়া'র মতে, ২০২০ সালে শুরু হওয়া কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাসের এই ধারা আরও ত্বরান্বিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে; ২০৩০ থেকে ২০৪৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) কর্মক্ষম মানুষ হারিয়ে যেতে পারে।
শহরের দিকে তরুণদের অভিবাসন, গ্রামীণ জন্মহার হ্রাস এবং বার্ধক্যের কারণে প্রতি বছর কৃষিজীবী জনসংখ্যা সংকুচিত হচ্ছে। গত বছর 'স্ট্যাটিস্টিকস কোরিয়া' কর্তৃক প্রকাশিত ‘২০২৪ সালের কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য জরিপ’ অনুসারে, ২০২৪ সালে কৃষিজীবী জনসংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৪ হাজার (২.০০৪ মিলিয়ন), যা আগের বছরের চেয়ে ৮৫ হাজার (বা ৪.১ শতাংশ) কম।