৩০ মে ২০২৬, ১২:৩৩

যৌতুকের জন্য হত্যা নাকি আত্মহত্যা: ভারতে মডেল ও অভিনেত্রীর মৃত্যু নিয়ে রহস্য

সাবেক ‘মিস পুনে’ খ্যাত তারকা তিশা শর্মা  © সংগৃহীত

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালে (১২ মে) তিশা শর্মা নামের এক তরুণীর মৃত্যু নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলছে। যৌতুকের দাবিতে তিশাকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন তা নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।

৩৩ বছর বয়সী মডেল ও অভিনেত্রী তিশা শর্মার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল আইনজীবী সমর্থ সিংয়ের। এর মাত্র পাঁচ মাস পরই শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এই সময় অনলাইনের খবরে জানা গেছে, তিশার হত্যার ঘটনা তদন্তে সিবিআই-'টানেল ভিউ টেকনিক' ব্যবহার করছে । মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে ঠিক কী কী ঘটেছিল তা জানতে সিসিটিভি, মোবাইল ফোন কলের রেকর্ড, ওয়াই-ফাই লগ ইন, ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্ট ডিভাইস ডেটা, ফরেনসিক ম্যাপিং-সহ আরও নানা প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তদন্ত চলছে।

গত বৃহস্পতিবার তিশার শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিল সিবিআই। বাড়ির ডিজিটাল ম্যাপিং করা হয় সেখানে। তিশার স্বামী সমর্থ সিংকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভোপালের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তিশার শাশুড়ি ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গিরিবালা সিংকে।

তিশার মা–বাবা ও ভাইবোনদের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে সমর্থ ও তাঁর মা অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গিরিবালা সিং তিশার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাতেন। তাঁরা তিশাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন।

তবে এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন গিরিবালা সিং। তাঁর দাবি, তিশা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি নিজেই নিজের জীবন শেষ করেছেন।

পুলিশ কর্মকর্তা রজনীশ কাশ্যপ কৌল বলেন, সিং পরিবারের বিরুদ্ধে যৌতুকের কারণে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। তিশার মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই মূল অভিযুক্ত সমর্থ সিং পলাতক ছিলেন। অবশেষে গত শুক্রবার (২২ মে) সন্ধ্যায় আত্মসমর্পণ করেছেন। এর আগে ভোপালের একটি আদালত গিরিবালা সিংকে আগাম জামিন দিলেও সমর্থের জামিন আবেদন খারিজ করে দেন এবং তাঁকে ২৩ মের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।

গিরিবালা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনাদের মনে রাখা উচিত যে আমার ছেলে তার ভালোবাসার মানুষ হারিয়েছে, সে তার জীবনসঙ্গী হারিয়েছে। আর আমরা এখন শোক পর্যন্ত পালন করতে পারছি না...সবাই আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে।’

এদিকে তিশার পরিবার তাঁর মরদেহ দাহ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের দাবি তুলেছে। প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গলায় ফাঁস দেওয়ার কারণে তিশার মৃত্যু হয়েছে। তবে তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় শুক্রবার হাইকোর্ট পরিবারের আবেদন মঞ্জুর করে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এত বেশি আগ্রহের মূল কারণ, তিশার নিজের পরিচিতি এবং তাঁর শ্বশুরের বাড়ির সামাজিক মর্যাদা।

মডেল ও অভিনেত্রী তিশা ২০১২ সালে ‘মিস পুনে’ খেতাব জেতেন। তিনি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন এবং একটি তেলেগু ভাষার চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিপণন (মার্কেটিং) কর্মকর্তা হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যরা তাঁকে একজন সুখী, উদার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

পরিবার জানায়, ২০২৪ সালে একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে ভোপালের আইনজীবী সমর্থের সঙ্গে তিশার পরিচয়। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁদের বিয়ে। বিয়ের দিনের ছবিগুলোতে এ দম্পতিকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছিল।

তবে তিশার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁদের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। বিয়ের সময় পর্যাপ্ত যৌতুক দেওয়ার পরও সিং পরিবার প্রতিনিয়ত তিশাকে খোটা দিত যে এ বিয়ে তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী হয়নি। অবশ্য গিরিবালা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ভারতে যৌতুক দেওয়া–নেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।

তিশার পরিবার সম্প্রতি তাঁর কিছু হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার ছবি প্রকাশ করে। পরিবারের কাছে পাঠানো সেসব বার্তায় তিশা অভিযোগ করেছিলেন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে নির্যাতন করেন। একটি বার্তায় তিনি লেখেন, ‘আমার জীবনটা জীবন্ত নরক হয়ে গেছে।’

এসব বার্তা প্রকাশের পর এ দম্পতির দাম্পত্য জীবন নিয়েও ব্যাপক তদন্ত চলছে।

তিশার পরিবারের দাবি, গত এপ্রিলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চরমে ওঠে। স্বামী ও শাশুড়ি তাঁর ‘চরিত্র’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অন্য কারও সন্তান গর্ভে ধারণ করার অপবাদ দেন। এরপর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁকে গর্ভপাত করাতে বাধ্য করা হয়।

তবে গিরিবালা সিং এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিশা নিজেই সন্তান চাননি, নিজেই গর্ভপাতের জন্য জোর করেছিলেন।

তিশার বাবা নবনিধি শর্মা বলেন, ১২ মে রাতে মৃত্যুর ঠিক কিছু আগে রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিশা শেষবার তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিশা তার মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল, হঠাৎ লাইনটি কেটে যায়।’ এরপর ২০ মিনিট ধরে চেষ্টা করলেও কেউ ফোন ধরেননি। পরে গিরিবালা ফোন ধরে বলেন, ‘তিশা আর বেঁচে নেই।’

তিশার পরিবারই প্রথম পুলিশকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানায়। পরিবারটির অভিযোগ, মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেন পুলিশকে খবর দেননি? নবনিধি শর্মা বলেন, ‘একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক নিশ্চয়ই ভালো করে জানেন যে এমন পরিস্থিতিতে কী আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়।’

অবশ্য গিরিবালা সিংয়ের দাবি, তিশাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেই পুলিশকে জানাতে দেরি হয়েছিল।

মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাবেক বিচারক গিরিবালা ইদানীং সংবাদ সম্মেলন করা এবং সংবাদমাধ্যমে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেওয়ার কারণেও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি তিশার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলেন এবং তাঁকে ‘উদার’ বলে আখ্যা দেন। পরে এক সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী এ শব্দের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, তিশা উচ্ছৃঙ্খল ও অশ্লীল জীবন যাপন করতেন। গিরিবালার এমন মন্তব্য ভারতজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তাঁর জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারের দাবি তুলছেন।

তিশার বাবার অভিযোগ, সাবেক এই বিচারক পরিকল্পিতভাবে তাঁর মৃত মেয়ের নাম ও সম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছেন।

পুলিশের তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তিশার পরিবার। তাদের অভিযোগ, তদন্তে শুরু থেকেই অবহেলা করা হয়েছে। অবশ্য তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ স্বীকার করেছেন ভোপালের পুলিশ কমিশনার সঞ্জয় কুমার। শুরুতেই হত্যাকাণ্ড বা খুনের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং এখন পর্যন্ত আমাদের তদন্তের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, এটি আত্মহত্যার ঘটনা।’

তিশার বাবা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্ত—উভয় নিয়েই প্রশ্ন তুলে দাবি করেছেন, তাঁর মেয়েকে খুন করা হয়েছে। প্রভাবশালী মহল এ তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।

পুলিশ কমিশনারের এ মন্তব্যই মামলার শেষ কথা নয়। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ঘোষণা করেছেন, এ চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত এখন ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি তিশার পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার তাদের ‘পূর্ণ সহযোগিতা’ করবে।

মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিশার বাবা নবনিধি শর্মা বলেন, ‘আমার মেয়ে বেঁচে থাকতে অন্যায়ের শিকার হয়েছে। এখন মৃত্যুর পরও যাতে সে বিচার না পায়, সে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমরা বিচার না পাওয়া পর্যন্ত শান্ত হব না।’