‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা’ অনুপ্রবেশকারীদের পশ্চিমবঙ্গে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির নির্দেশ
চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বারবার ভোটের মাঠে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বিতর্ক নিয়ে বেশ সরব ছিল। সেখানে এবার প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসে সেই বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কঠোর হচ্ছে শুভেন্দু অধিকারির সরকার। কথিত ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা’ অনুপ্রবেশকারীদের আটক রাখার জন্য পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায় 'হোল্ডিং সেন্টার' বা আটক শিবির তৈরির নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার।
গত সপ্তাহের শেষে রাজ্য পুলিশের কাছে পাঠানো এক সরকারি নোটে প্রতিটা জেলায় আটক হওয়া বিদেশিদের জন্য এই ‘‘হোল্ডিং সেন্টার’ গড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে গত এক বছরে এ ধরনের হোল্ডিং সেন্টার গড়া হলেও পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হলো। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় কেবল অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটক ব্যক্তিরাই নন, বরং জেল থেকে সাজার মেয়াদ শেষে ছাড়া পাওয়া যেসব বিদেশি নাগরিক নিজ দেশে প্রত্যর্পিত হওয়ার জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদেরও এই হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে।
সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বেআইনিভাবে দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যর্পণ পদ্ধতি সংক্রান্ত যে নির্দেশ গত বছর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়েছিল, সেই পদ্ধতি মেনেই এই সেন্টারগুলো তৈরি করতে হবে। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের চিহ্নিতকরণ ও প্রত্যর্পণের জন্য প্রতিটি রাজ্যকে ‘স্পেশাল টাস্ক ফোর্স’ গঠন করতে হবে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিজেকে যে রাজ্যের বাসিন্দা বলে দাবি করবেন, সেই রাজ্যের পুলিশকে ৩০ দিনের মধ্যে পরিচয় যাচাই করে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। যদি ৩০ দিনের মধ্যে সেই রিপোর্ট না আসে, তবে সংশ্লিষ্ট ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (এফআরআরও) ওই ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
হোল্ডিং সেন্টার কী?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশ মেনে ইতিমধ্যে গুজরাত, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি ও ওড়িশাসহ ভারতের অন্য অনেক রাজ্যে হোল্ডিং সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। গত বছর ভারত শাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, মূলত বাংলায় কথা বলা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বড় অংশই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেসব রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া প্রকৃত ভারতীয় বাংলাভাষী মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিক।
কেনো এই হোল্ডিং সেন্টার?
পরিচয় যাচাইয়ের জন্য নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার মানুষকে দিনের পর দিন এসব অস্থায়ী শিবিরে আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে অনেককে বাংলাদেশে ‘পুশ-আউট’ বা ঠেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সোনালী খাতুন, মুর্শিদাবাদের মেহবুব শেখ ও পূর্ব বর্ধমানের মুস্তাফা কামালের মতো প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের পরে আবার ওপার থেকে ফিরিয়ে এনেছে ভারত সরকার।
পরিযায়ী শ্রমিক মঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক জানান, বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের হোল্ডিং সেন্টারে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু ভারতীয় বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে আটকে রেখে হেনস্তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যাদের অনেকেই পরবর্তীতে প্রকৃত ভারতীয় প্রমাণিত হয়েছেন। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গেও এখন এই হোল্ডিং সেন্টার গঠনের পর রাজ্যে নতুন করে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ অভিযান শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে সরব অর্থনীতিবিদ ও কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসু প্রশ্ন তুলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে আসলে কতজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা আছেন, সেই তথ্য আগে রাজ্য সরকারের প্রকাশ করা উচিত। তিনি জানান, ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত কতজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়েছে বা পুশ-ব্যাক করা হয়েছে, তা জানতে চেয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তথ্যের অধিকার আইনে আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব মেলেনি।