ইরানের ক্ষমতায় আহমদিনেজাদকে বসানোর ছক কষেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল: নিউইয়র্ক টাইমস
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর ইরানের শাসনক্ষমতায় দেশটির কট্টরপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমদিনেজাদকে বসানোর একটি অত্যন্ত গোপন ও ‘দুঃসাহসিক পরিকল্পনা’ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা ও নীতি-নির্ধারক কর্মকর্তাদের সূত্রের বরাতে পত্রিকাটি জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হলেও তা বাস্তবায়নের শুরুতেই ‘দ্রুত ভেস্তে যায়’ এবং বর্তমানে আহমদিনেজাদের অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন যে ইরানের ভেতর থেকেই দেশের দায়িত্ব নিলে তা সবচেয়ে ভালো হবে। ট্রাম্পের এই ইঙ্গিত মূলত মাহমুদ আহমদিনেজাদের দিকেই ছিল। যদিও ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালীন আহমদিনেজাদকে চরম ইসরায়েল-বিরোধী (ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার ডাক দেওয়া) এবং কট্টর পশ্চিমা-বিরোধী নেতা হিসেবেই বিশ্ব চিনত, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্তমান ইরানি শাসন ব্যবস্থার সাথে তাঁর চরম দূরত্ব তৈরি হয়েছিল এবং তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন।
তবে ২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে আহমদিনেজাদ খোদ ট্রাম্পকে ‘হিসাবি ব্যবসায়ী ও কাজের মানুষ’ আখ্যা দিয়ে দু'দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে ধরে নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন নেত্রী ডেলসি রদ্রিগেজকে হোয়াইট হাউজের ছকে বসানোর সফল মডেলটিই ইরানে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে আহমদিনেজাদের সাথেও যোগাযোগ বা পরামর্শ করা হয়েছিল।
তবে মার্কিন-ইসরায়েলি এই পরিকল্পনাটি দ্রুতই ওলটপালট হয়ে যায়। যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে আহমদিনেজাদের বাড়ির ওপর ইসরায়েলি বিমান বাহিনী একটি হামলা চালায়, যার উদ্দেশ্য ছিল তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা। মার্চ মাসে মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-এর একটি নিবন্ধে এটিকে মূলত একটি ‘জেলব্রেক অপারেশন’ বা বন্দি ছিনতাই অভিযান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এই হামলার চেষ্টা করতে গিয়ে ইসরায়েলি বোমাটি আহমদিনেজাদের বাড়ির খুব কাছে আঘাত হানে এবং তিনি নিজেই গুরুতর আহত হন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আহমদিনেজাদ এই পুরো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের সাথে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি, আহত অবস্থাতেই গৃহবন্দিত্ব থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান এবং এরপর থেকে এই সাবেক নেতাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা আহমদিনেজাদের সাথে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ব্যাপক বিরোধ তৈরি হয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও পশ্চিমাদের সাথে গোপনে আঁতাতের অভিযোগও উঠেছিল। কিন্তু মার্কিন ও ইসরায়েলি পরিকল্পনাকারীরা ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে যেভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, আহমদিনেজাদের পিছুটান এবং আকস্মিক আহতের ঘটনায় সেই রাজনৈতিক ছক পুরোপুরি ভেস্তে যায়।