সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি জয় পেল পাকিস্তান
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বড় আইনি জয় পেয়েছে পাকিস্তান। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (পিসিএ) পাকিস্তানের করা আবেদনের পক্ষে রায় দিয়ে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ভারতের ‘পন্ডেজ’ ব্যবহারের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের অবস্থানকে সমর্থন করেছে।
এই রায়ের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত ‘ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি’ বা সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হলো। গত বছরের এপ্রিলে ভারত একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিলেও আদালত জানিয়েছে, ভারত এককভাবে এই চুক্তি স্থগিত করতে পারে না।
গত শুক্রবার পিসিএ তাদের আগের রায় বহাল রেখে জানায়, আইডব্লিউটি এখনো কার্যকর রয়েছে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহেলগামে প্রাণঘাতী হামলার পর গত বছর ভারত চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল।
এরপর গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তান সরকার জানায়, ‘পিসিএর রায় পাকিস্তানের মূল অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে যে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোতে ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর চুক্তিটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।’
পাকিস্তানের অভিযোগ, রাতলে ও কিশেঙ্গাঙ্গার মতো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভারত সাময়িকভাবে পানির প্রবাহ আটকে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিশেষ করে ‘পন্ডেজ’ ও গেটযুক্ত স্পিলওয়ের মাধ্যমে এটি সম্ভব বলে আশঙ্কা করছে ইসলামাবাদ।
‘পন্ডেজ’ বলতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন অনুযায়ী পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে জলবিদ্যুৎ বাঁধে সাময়িকভাবে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পিসিএর এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। গত শনিবার এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘ভারত বর্তমান তথাকথিত রায়কে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে, যেমনটি অবৈধভাবে গঠিত তথাকথিত কোর্ট অব আরবিট্রেশনের (সিওএ) আগের সব ঘোষণাও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারত কখনোই এই তথাকথিত সিওএ গঠনকে স্বীকৃতি দেয়নি।’
ভারত আরও বলেছে, ‘এ ধরনের কোনো কার্যক্রম, রায় বা সিদ্ধান্ত বাতিল ও অকার্যকর।’ একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ‘ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটিকে স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে।’
বোস্টনভিত্তিক পানি আইন ও নীতিবিষয়ক গবেষক ইরুম সাত্তার মনে করেন, পিসিএর এই রায় চুক্তির একটি কারিগরি ও আইনগতভাবে সঠিক ব্যাখ্যা। তবে ভারত-পাকিস্তানের বর্তমান সম্পর্কের কারণে এর বাস্তব প্রভাব সীমিত হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘যখন কোনো পক্ষ আন্তর্জাতিক আইনসম্মত কাঠামোর নিয়ম মানতে অস্বীকৃতি জানায়, যে কাঠামোয় অংশ নিতে সে নিজেই একসময় সম্মত হয়েছিল, তখন এই চুক্তির অর্থ কী থাকে এবং এটি বাস্তবে কী অর্জন করতে পারে?’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তত স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে ভারত তার সীমালঙ্ঘনমূলক পথেই এগোবে, আর পাকিস্তানকে নিজেদের আইনি দাবি বাস্তবায়নে সৃজনশীল উপায় খুঁজতে হবে।’
এই রায় এমন সময়ে এসেছে, যখন গত বছরের মে মাসে তিন দিনের সংঘাতের পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক প্রায় স্থবির হয়ে আছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ কমে গেছে এবং একে অপরের এয়ারলাইন্স চলাচলেও বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে।
তবে সম্প্রতি ভারতের ডানপন্থী সংগঠন আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এবং দেশটির এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে মন্তব্য করেছেন। আরএসএস হলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির আদর্শিক মূল সংগঠন।
নিউইয়র্কভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ননরেসিডেন্ট ফেলো সাহার খান বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান দুটো দেশই বোঝে যে, পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় অন্তত ন্যূনতম পর্যায়েও তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুই পক্ষ যদি কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন না করে, তাহলে তাদের তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা আদর্শ পরিস্থিতি নয়।’
সুইডেনের আপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত গবেষণার অধ্যাপক অশোক সোয়াইন বলেন, ‘এটি সেই ধারণাকেই আরও জোরালো করে যে, কূটনীতির চেয়ে কঠোর অবস্থানই এখনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বেশি কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে।’
নিক্কেই এশিয়াকে তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় থাকা পাকিস্তানের পক্ষেও অর্থবহ নতুন সূচনা করার সক্ষমতা সীমিত ছিল।’
এদিকে ভারত আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে গেলেও পাকিস্তান কূটনৈতিক চাপ তৈরির পথেই এগোচ্ছে। পাকিস্তান সরকারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আইডব্লিউটি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের শক্তিকে ব্যবহার করতে থাকবে।’