১৭ মে ২০২৬, ১০:০৭

ড্রোন যুদ্ধে বদলে যাচ্ছে ভারত-পাকিস্তানের সামরিক কৌশল, কে এগিয়ে?

ভারতীয় সামরিক বাহিনী  © সংগৃহীত

এক বছর আগে পাকিস্তানের কিছু স্থাপনায় হামলা চালায় ভারতীয় সামরিক বাহিনী, ভারতের দাবি অনুযায়ী যেগুলো ছিল ‘সন্ত্রাসবাদীদের শিবির’। ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে ২০২৫ সালের ২২শে এপ্রিল বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন পর্যটক ও স্থানীয় একজন ব্যক্তি নিহত হন; তারপরেই ওই সামরিক অভিযান চালায় ভারত, যার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সিন্দুর’। ভারত অভিযোগ করেছিল, ‘পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোই পহেলগাম হামলার জন্য দায়ী।’ তবে পাকিস্তান ওই ঘটনার দায় অস্বীকার করে।

এরপর উপমহাদেশের দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ২০২৫ সালের সাতই মে থেকে ১০ই মে যে সামরিক সংঘাত হয়, তা বলতে গেলে যুদ্ধকৌশলের একটি নতুন দিক খুলে দেয়। বলা যেতে পারে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সেটিই ছিল প্রথম ড্রোন যুদ্ধ। সামরিক পরিভাষায় যুক্ত হয় একাধিক নতুন শব্দ— ‘ইহা’, ‘হারোপ’ এবং ‘সংগার’। দুই দেশই এই ধরনের আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেম ব্যবহার করে। এই ধরনের সিস্টেম কয়েক দশক ধরেই ব্যবহার হচ্ছে। মার্কিন প্রেডেটর ড্রোন আগেও আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইয়েমেনে বেশ কিছু হামলা চালিয়েছে; কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আগের সেই আধিপত্য এখন আর কোনো একটি দেশের একচেটিয়া নয়।

ড্রোন প্রযুক্তি উচ্চ গতি, কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে আধুনিক যুদ্ধের ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পর্যন্ত ড্রোনকেন্দ্রিক যুদ্ধই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এক বছর আগে, পাকিস্তানের রাডার ধ্বংস করার জন্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গেই হামলা চালাতে সক্ষম এমন ড্রোন ব্যবহার করেছিল ভারত। ওই ধরনের ড্রোনগুলোকে ‘লয়টারিং মিউনিশন’ বলা হয়। পাকিস্তানও সেই সময় ভারতীয় স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ‘সোওয়ার্ম ড্রোন’ বা গুচ্ছ-ড্রোন ব্যবহার করেছিল।

এক বছর পরেও, সেই চার দিনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে দুই দেশের সামরিক মহল। ড্রোন যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করছেন ভারতের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গোটা দেশের জন্য ড্রোন-প্রতিরোধী নীতি প্রণয়নের কাজ করছে। তবে, ভারতীয় সামরিক শীর্ষ কর্তারা এও বলছেন, ড্রোন ব্যবহারের এই ঝোঁক ২০২৫ সালের মে মাসের অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পহেলা নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩১শে অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ৩৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে ১৮১৬টি ড্রোন দেখা গেছে।

আরও পড়ুন: অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তির আবেদন শুরু আজ

ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফ-এর মতে, পাকিস্তান থেকে ভারতে মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাও ২০২৩ সালে বলেছিলেন যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ড্রোন দিয়ে পাচারকারীরা হেরোইন পাঠাচ্ছে। জম্মুতে ২০২১ সালের জুন মাসে, ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ পরে জানায় যে ওই হামলায় ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। পুলিশ এও জানিয়েছিল, ওই হামলার লক্ষ্য ছিল বিমানবাহিনীর বিমানগুলো। তবে কোনোরকম ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি ওই সময়। এই ঘটনার পর থেকে সামরিক স্থাপনাগুলোর চারপাশের নিরাপত্তা এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়।

ইসলামাবাদে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মুহাম্মদ আলী বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও তালিবানের ড্রোনের কারণে পাকিস্তানকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা এবং হামলা চালানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ড্রোনের। গত কয়েক বছর ধরে সংঘাতের কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা এবং আকাশসীমা সুরক্ষিত করায় জোর দিয়েছে ভারত। তেমনি ২০২৪ সাল থেকে পাকিস্তানও ভারত, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এজন্যই ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে অস্ত্রসহ ড্রোন যেমন আছে, তেমনই রয়েছে বিনা-অস্ত্রের ড্রোনও।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর ডিরেক্টর জেনারেল (এয়ার অপারেশনস), এয়ার মার্শাল একে ভারতী সম্প্রতি জানিয়েছেন, কীভাবে পাকিস্তানের অনবরত ড্রোন অভিযান ভারতকে বাধ্য করেছিল পাল্টা অভিযান চালাতে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ‘আগে আমরা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার বা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে নজর রাখতাম। পাশাপাশি এখন আমাদের সব আকার ও আকৃতির এবং বিভিন্ন উচ্চতায় থাকা ড্রোনও শনাক্ত করতে হচ্ছে।’ আর এর প্রভাব শুধু সংঘাতই সীমাবদ্ধ নয়।

‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানের ক্ষেত্রে ড্রোন কীভাবে ধীরে ধীরে প্রচলিত বিমান হামলার জায়গা নিচ্ছে তা পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন। কথিত ‘সন্ত্রাসীবাদীদের’ বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানে থাকা একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ‘ড্রোন-ভিত্তিক অভিযানগুলো বেশি কার্যকর, কারণ ড্রোন হামলায় পারিপার্শ্বিক ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়।’ প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. জি সতীশ রেড্ডি বিবিসিকে জানান যে, ভারত কীভাবে তাদের সমন্বিত ব্যবস্থা ‘কাইনেটিক ইন্টারসেপ্টর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার জ্যামার এবং ‘লেগ্যাসি’ নামের আকাশ প্রতিরক্ষা কামান মোতায়েন করে সফলভাবে বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করেছে।’

যদিও তাদের মতে খরচ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শত্রুর ছোঁড়া সস্তা ড্রোন ধ্বংস করার জন্য দামী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। তাই খরচের কথা মাথায় রেখেই সমাধান খুঁজতে হয়।’ তবে এয়ার মার্শাল একে ভারতীও যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু স্বল্পমূল্যের ড্রোনের প্রভাবকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য লক্ষ্যবস্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকতে হবে। ‘ব্রহ্মোস’ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রের দ্বারাই তা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন: রমনা বিভাগে ডিসি মাসুদের স্থলাভিষিক্ত হলেন আলোাচিত এসপি জাহিদুল

পাকিস্তানও বলছে যে তারাও সংঘর্ষের সময়ে ড্রোনের বড়সড় হামলা নিষ্ক্রিয় করেছে। সৈয়দ মুহাম্মদ আলী বলেছেন, পাকিস্তান ড্রোনের বিরুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে রোখা যায় এমন কাইনেটিক পদ্ধতি এবং প্রযুক্তি দিয়ে আটকানো যায় এমন নন-কাইনেটিক প্রতিরোধী ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা বিবিসিকে আরও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানে প্রচলিত বিমান হামলার পরিবর্তে ড্রোন-ভিত্তিক অভিযান ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু ড্রোনের বিরুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষার এই বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরে চার হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। যদিও খুব কম সংখ্যকই তাদের লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে, এই হামলাগুলো বিশ্বের জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ভারত বলছে, তারা তাদের সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে একটি বহুস্তরীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে এই ধরনের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছে। ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে ভারত বিশ্বের পঞ্চম অবস্থানে ছিল (প্রায় ৯২১০ কোটি ডলার)। তুলনামূলকভাবে, পাকিস্তান এ সময় ব্যয় করেছে প্রায় ১১৯০ কোটি ডলার।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে ইসরায়েল-নির্মিত একাধিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। নজরদারির জন্য প্রধানত হেরন এবং সার্চার এমকে-ওয়ান/টু ড্রোন ব্যবহার করা হয়। ভারত এখন শুধু দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে এমন ড্রোনের পাশাপাশি আঘাত করার ক্ষমতা আরও বেশি হবে এমন ড্রোনও চাইছে। জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত ৩১টি এমকিউ-৯বি 'হাই অল্টিটিউড লং এনডিউরেন্স' বা ‘হেল’ ড্রোন কেনার চুক্তি করেছে। এগুলো ২০২৯ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হতে পারে। তবে হামলা চালানোর ড্রোন— যাকে ‘লোইটারিং মিউনিশন’ বা কামিকাজি ড্রোন বলা হয়, সেরকম ড্রোনের জন্য ভারত এখনো মূলত আমদানির ওপরেই নির্ভরশীল।

ভারত ছোট আকারের কৌশলগত ড্রোন নির্মাণে আত্মনির্ভর হওয়ার দিকে জোর দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন একটি ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ সিস্টেম নিয়ে কাজ চলছে। তবে একটি বড় বাধা হলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ ব্যবস্থা। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনদীপ সিং বলেছেন, ফ্লাইট কন্ট্রোলার ও কমিউনিকেশন হার্ডওয়্যারসহ ড্রোনের মূল যন্ত্রাংশের বাজারে চীনের আধিপত্য রয়েছে। ভারতকে তার সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য চীনের ওপরে নির্ভরতা কমাতে হবে।

অন্যদিকে, সামরিক বাজেট কম হওয়া সত্ত্বেও সশস্ত্র ড্রোন ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভারতের চেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান তুরস্ক ও চীন থেকে ৩৫টি সশস্ত্র ড্রোন পেয়েছে। পাকিস্তান দেশীয়ভাবে শাহপার সিরিজ এবং ‘বর্রাক’-এর মতো সিস্টেম তৈরি করার চেষ্টা করছে। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সেনাবাহিনীই ২০২৫ সালের সংঘাতকে একটি শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতিটি সৈন্যের হাতে ‘ঈগল তুলে দেওয়ার’ লক্ষ্যে কাজ করছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত সোয়ার্ম ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধ করার প্রযুক্তির উন্নয়ন।

তবে বিশ্লেষকরা সাবধান করছেন, ড্রোনকে কৌশলগত ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দেওয়ার সরঞ্জাম হিসেবে দেখা উচিত হবে না। জ্যেষ্ঠ গবেষক ম্যাথিউ জর্জ বলেন, ড্রোন মানুষের কাজকে আরও সহজ করে ঠিকই, তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাইলে ড্রোন শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। এমিলি হার্ডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন ‘ড্রোন কি উভয় পক্ষের জন্য একটি কম ধ্বংসাত্মক উপায়, নাকি এটি লড়াইকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার শুরু?’