১১ মে ২০২৬, ১০:৩২

মরুভূমিতে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি, যেভাবে শনাক্ত করল ইরাক

ইরাকের মরুভূমিতে ইসরায়েলের ঘাঁটি   © সংগৃহীত


ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে গোপনে একটি সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল ইসরায়েল। যুদ্ধের শুরুতেই ওই ঘাঁটির অবস্থান প্রায় শনাক্ত করে ফেলেছিল ইরাক। এরপর অনুসন্ধানে যাওয়া ইরাকি সেনাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

বিষয়টি সম্পর্কে জানাশোনা আছে এমন কয়েকজন ব্যক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞাতসারেই ইসরায়েল এই গোপন ঘাঁটি তৈরি করেছিল। সেখানে অবস্থান করছিল ইসরায়েলের বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা। ঘাঁটিটি মূলত ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

জানা গেছে, ইরানের আকাশে অভিযানের সময় কোনো ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে পাইলটদের দ্রুত উদ্ধার করতে সেখানে ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিম’ও মোতায়েন ছিল। যদিও যুদ্ধ চলাকালে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানান, ইরানের ইসফাহানের কাছে একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। তখন উদ্ধার অভিযানে সহায়তার প্রস্তাব দেয় ইসরায়েল। পরে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব বাহিনীর মাধ্যমে দুই পাইলটকে উদ্ধার করলেও ওই অভিযানে নিরাপত্তা সহায়তা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী।

মার্চের শুরুতে স্থানীয় এক রাখাল প্রথম অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতা দেখতে পান। ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওই এলাকায় হেলিকপ্টার চলাচল ও অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করে বিষয়টি নিরাপত্তা বাহিনীকে জানান। এরপর ইরাকি সেনারা হামভি যান নিয়ে ভোরের দিকে সেখানে অনুসন্ধানে যান।

ইরাকের সামরিক বাহিনীর ‘জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ড’-এর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ডেপুটি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাইস আল-মুহাম্মাদাওয়ি বলেন, 'এই বেপরোয়া অভিযানটি (বাগদাদের সঙ্গে) কোনো ধরনের সমন্বয় বা অনুমোদন ছাড়াই চালানো হয়েছে।'

তিনি জানান, অভিযানের সময় ইরাকি সেনারা তীব্র গুলিবর্ষণের মুখে পড়েন। এতে এক সেনা নিহত ও দুজন আহত হন। পরে ইরাকের কাউন্টার টেররিজম সার্ভিসের আরও দুটি ইউনিট সেখানে পাঠানো হয়। আইএসবিরোধী যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এসব ইউনিট ঘটনাস্থলে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির প্রমাণ পায়।

মুহাম্মাদাওয়ি আরও বলেন, 'হামলার আগেই ওই এলাকায় একটি নির্দিষ্ট বাহিনী অবস্থান করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিমানবাহিনী তাদের সহায়তা করছিল। ওই বিমানবাহিনীর শক্তি আমাদের ইউনিটগুলোর সামর্থ্যের বাইরে ছিল।'

পরে মার্চ মাসেই বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে ইরাক। অভিযোগে বলা হয়, বিদেশি বাহিনী ওই হামলায় জড়িত ছিল এবং এতে বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। যদিও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত ছিল না।

ইরাকের আনবার প্রদেশের আল-নুখাইব এলাকার কাছে অবস্থিত এই স্থাপনাটি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য অস্থায়ী ‘ফরওয়ার্ড আর্মিং ও রিফুয়েলিং পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, দূরবর্তী শত্রু অঞ্চলে আকাশ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এ ধরনের অস্থায়ী ঘাঁটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় এক হাজার মাইল দূরের ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিমান অভিযান চালাতে এই ঘাঁটি ইসরায়েলকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।

কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজ-এর গবেষণাপ্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, 'অভিযানের আগে স্থান রেকি (পর্যবেক্ষণ) করা এবং অস্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করা স্বাভাবিক।'

তিনি বলেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনবসতিহীন মরুভূমি এ ধরনের গোপন ঘাঁটি স্থাপনের জন্য আদর্শ জায়গা। অতীতে সাদ্দাম হোসেনবিরোধী মার্কিন অভিযান চলাকালেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী এই অঞ্চল ব্যবহার করেছিল।

মাইকেল নাইটস আরও বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতা দেখে অভ্যস্ত। কখনো আইএসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী, আবার কখনো বিশেষ বাহিনীর অভিযানের কারণে মানুষ এসব এলাকা এড়িয়ে চলেন।

চলমান যুদ্ধের সময় স্থানীয়রা ওই অঞ্চলে হেলিকপ্টারের অস্বাভাবিক তৎপরতাও দেখেছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে ইসরায়েলের কর্মকর্তারাও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে গোপন অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। মার্চের শুরুতে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রধান তোমের বার বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, 'সম্প্রতি বিমানবাহিনীর বিশেষ ইউনিটের যোদ্ধারা এমন কিছু বিশেষ মিশন পরিচালনা করছেন, যা কল্পনাকেও হার মানাতে পারে।'