০৭ মে ২০২৬, ০৯:৩৪

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে কি কি রয়েছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট   © টিডিসি ফটো

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তিন মাসব্যাপী যুদ্ধ বন্ধে করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চিরশত্রু এই দুই দেশ এক পাতার একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে এবং একটি টেকসই কাঠামো তৈরিতে একমত হতে চলেছে। 

এই প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে এবং বিদেশে আটকে থাকা শতকোটি ডলারের তহবিল ফেরত পাবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই কূটনৈতিক অগ্রগতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় আমরা খুব ভালো আলোচনা করেছি এবং একটি চুক্তি হওয়া খুবই সম্ভব।’ 

তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে আরও বলেন, যদি ‘ইরান যা দিতে সম্মত হয়েছে তাতে রাজি থাকে,’ তবে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। অন্যথায় তিনি দেশটিতে আগের চেয়ে ‘আরও অনেক উচ্চ মাত্রায় এবং তীব্রতায়’ বোমা হামলা চালানোর হুমকি দেন। 

এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ থেকে মুক্ত করতে চাইছেন।

খসড়া মেমো অনুযায়ী, উভয় দেশই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের ওপর থেকে সব বিধিনিষেধ তুলে নেবে। ইরানকে অন্তত ১২ থেকে ১৫ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তেহরান কেবল ৩.৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্ন মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে। এছাড়া ইরানকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা এ সংক্রান্ত কোনো কাজ করবে না।

চুক্তিতে আরও থাকছে, ইরান কোনো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা করবে না এবং জাতিসংঘের পরিদর্শকদের মাধ্যমে ‘হঠাৎ পরিদর্শনের’ উন্নত ব্যবস্থায় রাজি থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মেমোতে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এবং ইরানি তহবিল মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, এবং সম্ভব হলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। 

এই মেমোটি একটি প্রাথমিক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে এবং এটি কার্যকর হওয়ার পর উভয় পক্ষ ৩০ দিনের একটি বিস্তারিত আলোচনায় বসবে। এই আলোচনাগুলো ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এই সমঝোতা নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সবুজ সংকেত আসেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও প্রস্তাব এখনও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’ তেহরান তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পর মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানাবে। 

অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ কিছুটা কঠোর সুর বজায় রেখে সতর্ক করেছেন যে, ওয়াশিংটন মূলত অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ তৈরির মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।

মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও এই চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ‘আমাদের একদিনেই সব চুক্তি লিখে ফেলতে হবে এমন নয়। বিষয়টি খুবই জটিল এবং প্রযুক্তিগত। তবে আমাদের এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান দরকার যেখানে কোন বিষয়ে তারা আলোচনা করবে এবং শুরুতে তারা কতটা ছাড় দেবে সে বিষয়গুলো পরিষ্কার থাকে।’ 

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত একটি টেকসই ঐক্যমতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। তা সত্ত্বেও, দুই পক্ষ বর্তমানে আলোচনার যে পর্যায়ে রয়েছে, তাকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।