চীনের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
আগামী সপ্তাহে চীন সফরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে নিজ দেশেই বেশ বেকায়দা পড়েছেন আংকেল স্যামের উত্তরসুরী খ্যাত ট্রাম্প। সেখান থেকে মনোযোগ সরাতেই চীন সফর এমন অভিযোগের পরিপরই এবার চীনের ওপর খড়গহস্ত হচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে অবৈধ অভিবাসী পেরানো নিয়ে চীনের উদাসীনতার জন্য দেশটির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। খবর রয়টার্সের
চলতি মাসের ১৩-১৫ মে বেইজিং সফরে যাবেন ট্রাম্প। সেই সফরের আগেই মার্কিন প্রশাসনের এমন তীর্যক মন্তব্যকে কীভাবে নিচ্ছে চীন সেটা বুঝা যাবে সফরের পরে। অবশ্য আসন্ন সফরে ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসন বন্ধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
ট্রাম্পের জন্য এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বেইজিংয়ের কাছ থেকে এমন কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা বা ছাড় পাওয়ার আশা করছেন, যা তিনি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করতে পারবেন। উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
গত বছরের শুরুতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে, ট্রাম্প এমন অনেক দেশের ওপর শুল্ক আরোপ ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে আসছেন যারা নির্বাসিত নাগরিকদের (ডিপোর্টি) ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, এটি ছিল তার নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং তার কঠোর অভিবাসন নীতির একটি কেন্দ্রীয় অংশ।
চীন দীর্ঘ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সেইসব অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে আসছে, যার মাধ্যমে দেশটি তাদের হাজার হাজার নাগরিককে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল—যারা যুক্তরাষ্ট্রে মেয়াদের অতিরিক্ত সময় অবস্থান করছেন অথবা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন।
একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে চার্টার্ড এবং বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মাধ্যমে প্রায় ৩,০০০ নির্বাসিত নাগরিককে ফেরত নেওয়ার পর, গত ছয় মাসে চীন এ বিষয়ে তাদের সহযোগিতা কমিয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের পরিকল্পনা নিয়ে অকপটে কথা বলার জন্য ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, চীন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে অস্বীকার করছে। তিনি একে চীনের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং নিজ জনগণের প্রতি দায়িত্বের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি আরও সতর্ক করে দেন যে, চীন যদি নির্বাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না বাড়ায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা আবেদনের সঙ্গে 'ক্যাশ বন্ড' বা জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে। সেই সঙ্গে আরও বেশি ভিসা প্রত্যাখ্যান এবং সীমান্তে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
ওই কর্মকর্তার তথ্যমতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখেরও বেশি নথিবিহীন (অবৈধ) চীনা নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ হাজারেরও বেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ (ফাইনাল অর্ডার অফ রিমুভাল) রয়েছে এবং তাদের মধ্য থেকে ১,৫০০-রও বেশি ব্যক্তিকে নির্বাসনের অপেক্ষায় আটক করে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, আটককৃতদের বেশিরভাগই অন্য কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত নথিবিহীন চীনা নাগরিকদের সংখ্যার বিষয়ে স্বতন্ত্র সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানে ভিন্নতা রয়েছে। মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের (এমপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার চীনা অভিবাসীর দেশটিতে অবস্থানের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন যে, ভারতেসহ অন্যান্য যেসব দেশের বিপুল সংখ্যক নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে নথিবিহীন অবস্থায় রয়েছেন, সেই দেশগুলো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।
ওবামা প্রশাসনের আমল থেকেই মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলে আসছে যে, চীন তাদের নির্বাসিত নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ নথি (ট্রাভেল ডকুমেন্ট) ইস্যু করার প্রক্রিয়াটি ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করে। তাদের মতে, বেইজিং হয় এসব নাগরিককে ফেরত নিতে চায় না, অথবা এই বিষয়টিকে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী লিভারেজ বা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চীন মাঝেমধ্যে তাদের এই নির্বাসন সংক্রান্ত অনুরোধগুলোকে একটি শর্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বেইজিং চায়, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন সেইসব অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অপরাধীদের তাদের হাতে তুলে দেয় (প্রত্যর্পণ), যারা চীন থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে।