০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৫

ইরান যুদ্ধকে যেভাবে ধর্মীয় রূপে উপস্থাপন করছেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প  © সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধে ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীক ব্যবহার করে যুদ্ধকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার বক্তব্য ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপে এই যুদ্ধকে ‘ঐশ্বরিকভাবে অনুমোদিত’ এবং ধর্মীয়ভাবে ন্যায়সঙ্গত হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি ইরান থেকে এক মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারের ঘটনাকে ট্রাম্প ‘ইস্টারের অলৌকিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেন। রবিবার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এই উদ্ধার ইস্টারের অলৌকিক ঘটনা।’ তার এই বক্তব্যের পর মন্ত্রিসভার আরও কয়েকজন সদস্য ইস্টার উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেস্যান্টও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইস্টারের তাৎপর্য থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

শুধু একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো যুদ্ধ পরিস্থিতিকেই ট্রাম্প ধর্মীয় ও নৈতিক ভাষায় ব্যাখ্যা করছেন। হোয়াইট হাউসে খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের দিয়ে আশীর্বাদ নেওয়া, ইরানকে ‘শয়তানি’ আখ্যা দেওয়া এবং সংঘাতকে বাইবেলের ‘আর্মাগেডন’ বা চূড়ান্ত যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।

একই দিনে দেওয়া আরেকটি বার্তায় ট্রাম্প তেহরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, অন্যথায় ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু উড়িয়ে দেওয়া হবে। ওই বার্তায় তিনি ‘তোমরা পাগল কুলাঙ্গাররা’, ‘নরকে বসবাস করতে হবে’—এ ধরনের মন্তব্য করার পর ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর’ বলে শেষ করেন।

ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলের খনি ও পানি পরিশোধনাগার লক্ষ্য করে হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রসিকিউটর লুইস মোরেনো ওকাম্পো বলেন, ‘ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বোমা হামলা চালানো কিংবা ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের পক্ষ থেকেই শক্তি বা জ্বালানি অবকাঠামোতে যেসব হামলা চালানো হচ্ছে, তার কোনোটিই নিয়ম অনুযায়ী বৈধ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত নয় এমন বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালানো’ আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত।

তবে হোয়াইট হাউস এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘অবশ্যই, এই প্রশাসন এবং মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী সবসময় আইনের সীমার মধ্যে থেকেই কাজ করবে। তবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র মূল লক্ষ্যগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো বাধা ছাড়াই সামনে এগিয়ে যাবেন।’

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের চারপাশে থাকা রক্ষণশীল খ্রিস্টান (ইভানজেলিকাল) উপদেষ্টারা এই ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে আরও জোরালো করে তুলছেন। তারা এই সংঘাতকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং ‘ধর্মীয় মহাযুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরছেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলো বাইবেলে বর্ণিত ‘শেষ সময়ের লক্ষণ’।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। সামরিক বাহিনীতে ধর্মীয় চর্চা বাড়ানো, প্রার্থনার আয়োজন এবং ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এক ধরনের ধর্মীয় আবহ তৈরি করছেন। পেন্টাগনে এক প্রার্থনায় তিনি ঈশ্বরের কাছে সাহায্য চেয়ে বলেন, ‘যারা কোনো দয়া পাওয়ার যোগ্য নয়, তাদের ওপর তীব্র ও বিধ্বংসী আক্রমণ চালাতে পারেন’।

এই পরিস্থিতিতে ডানপন্থীদের মধ্যেও কিছু অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এক রক্ষণশীল ভাষ্যকার ট্রাম্পের প্রধান ধর্মীয় উপদেষ্টা পলা হোয়াইট-কেইনকে ‘উন্মাদ ও ধ্বংসাত্মক ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। হোয়াইট-কেইন নিজেই বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে না বলা মানে স্বয়ং ঈশ্বরকেই না বলা।’

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের একাধিক বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যেন তাদের সিদ্ধান্তগুলো ‘ঐশ্বরিক নির্দেশনা’ থেকেই আসছে। আইনপ্রণেতাদের ‘যিশুর খাতিরে’ আইন পাসের আহ্বান থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকীকে ‘এক ঈশ্বরের অধীনে উৎসর্গ’ করার মতো বক্তব্যও সামনে এসেছে।

ধর্ম ও সামরিক শক্তির এই বিপজ্জনক মেলবন্ধন এখন মার্কিন সংসদে কড়া নজরদারির মুখে পড়েছে। আইনপ্রণেতারা সতর্ক করেছেন যে চরম ধর্মীয় কথাবার্তা সামরিক কমান্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। গবেষকরা মনে করেন, যখনই ক্ষমতার সাথে অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস মিলে যায়, যুদ্ধ তখন অস্তিত্বের লড়াইয়ে রূপ নেয় এবং তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো সৈনিককে এমন কোনো ধর্মের জন্য জীবন দিতে বলা উচিত নয় যা সে নিজে মানে না। এটি দেশের আত্মরক্ষা নয়, বরং ধর্মের নামে আদর্শিক জবরদস্তি।