হরমুজ প্রণালী থেকেই মুসলিম পতনের শুরু, হরমুজ প্রণালী থেকেই উত্থান
ইতিহাস কখনো বিদায় বলে না, বলে আবার দেখা হবে। ১৫১৫ সালের পরে হরমুজে আবার দেখা হচ্ছে পারস্য আর পশ্চিমাদের। মূলত ১৫১৫ খ্রিস্টীয় সনে হরমুজ প্রণালীর দখল আরবদের হাতছাড়া হওয়া থেকেই মুসলিম আমীর আল বহর তথা অ্যাডমিরালদের পতনের শুরু। ওদিকে হরমুজ আর এদিকে মালাবার, মালাক্কা হয়ে ভারতের গোয়া দ্বীপ পর্যন্ত আরব বাণিজ্যকেন্দ্র ও সভ্যনগরগুলি তছনছ করা হয়। চমকের ব্যাপার যে, হরমুজের খবর পর্তুগীজদের দিয়েছিল দুই ইহু/দি বণিক। ইউরোপিয়দের প্রথম সাম্রাজ্যবাদের লগ্নিপুঁজিতে ইহুদীদেরও অর্থ ছিল।
সেই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার হাতে তুলে নিয়েছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। পর্তুগীজদের জায়গায় আমেরিকা আর সাবেক ইহু/দি বণিকের জায়গায় যুদ্ধবাজ হাজরাইল। বরাবরের মতোই এই যুদ্ধে ফেউয়ের ভূমিকায় বাঘকে পথ দেখিয়ে এনেছে হরমুজের পূর্ণ দখল। ইরান তথা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুসলমানদের হাতে আসা মানে তাই ইতিহাসের প্রতিশোধ। সমুদ্রে আরবদের সামরিক সেয়ানাগিরি খতম করেছিল স্প্যানিশ আর্মাডা। তারা ব্রডসাইড কামানবাহী জাহাজ বানাতে পেরেছিল। এই জাহাজ একসাথে ডানে-বামে কামান দাগাতে পারতো এবং কামান দাগানোর ধাক্কায় জাহাজ বেসামাল হতো না। ইউরোপীয় সেই নৌশ্রেষ্ঠত্বই সারা দুনিয়া থেকে আরবদের ব্যবসা ও শাসন উচ্ছেদ করে দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিধর মার্কিন নৌবহর। মার্কিন বিশাল এয়ারক্র্যাফটবাহী সেই রণতরী এখন ইরানের ছোটো নৌযান আর সস্তা মিসাইলের কাছে কাবু হয়ে গ্রিসে গিয়ে মুখ লুকিয়েছে? ঠিক এভাবেই কি জার্মান উপজাতিদের হাতে রোমানদের, তুর্কি উপজাতিদের হাতে বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের পতন হয়নি? সর্বহারা শ্রেণী ধ্বংস করেনি রুশ সাম্রাজ্য? স্যান্ডেল পায়ে লুঙ্গি পরা হুতিদের কিন্তু আমেরিকা কিচ্ছু করতে পারেনি। কারণ, ইয়েমেনও কিন্তু এক প্রাচীন ও উন্নত সভ্যতার ওয়ারিশ।
ইতিহাসের কোনো দর্শক নাই, হয় ছাত্র আছে নয়তো শিকার আছে। কে কোনটা হবে সেটা তার মর্জি। কিন্তু আমরা দেখছি সাম্রাজ্যের পতনের কালো হাঁসের ওড়াউড়ি।
হরমুজে ইরানের কতৃত্ব, লোহিত সাগরের বাব আল মান্দাবে হুতিদের দাপটের বৈশ্বিক প্রভাব যুগান্তকারী। এক ডজন ব্রিকস, হাজারটা সম্মেলন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় দরকষাকষি দিয়ে যে পেট্রোডলারকেন্দ্রিক অর্থনীতি বদলানো যেত না, ইরান এক হরমুজ বন্ধ করে দিয়ে সেই অর্থনীতির গলা চিপে ধরেছে।
যারা ভাবছেন আমেরিকা খর্গ দ্বীপ দখল করতে আসবে, তারা ভুল। হরমুজের সরুমুখে থাকা খর্গ একটা মারণফাঁদ। আমেরিকার সৈন্যদের পক্ষে ল্যান্ড করার সম্ভাব্য জায়গা হলো বালুচিস্তান-সিস্তান প্রদেশ। আল্লাহর রহমতে সেই জায়গাটাও দুর্গম ও পাহাড়ী। ইরান তার জন্যও প্রস্তুত । তিনদিকে পাহাড় আর একদিকে সমুদ্র ঘেরা ইরান এক প্রাকৃতিক দুর্ভেদ্য দুর্গ। এই ইরানি পার্বত্য জঙ্গলের শিখরেই লুকিয়ে ছিল ইসলামাইলিয়া অ্যাসাসিনদের অপরাজেয় ঘাঁটি। ইরানের এক বৃদ্ধ কৃষক পুরনো বন্দুক দিয়ে একাই ৫ টা আমেরিকান ড্রোন ফেলেছে, মনে রাইখেন।
ইরানের বাহিনীর তিনটি লেয়ার :
আইআরজিসি দেখে বহিশত্রু
সেনাবাহিনী সুরক্ষিত রাখে রাষ্ট্রীয় সীমানা
আর বাসিজ দেখে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা
আগ্রাসী বাহিনীর পক্ষে এর একটি স্তরও ভেদ করা অসম্ভব। ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পরপরই ইরান দেখেছে যে শাহের আমলের সেনাবাহিনী দিয়ে বিপ্লব সুরক্ষা তো সম্ভবই না, বরং তারাই সম্ভাব্য প্রতিবিপ্লব । সেই জায়গা থেকেই এই জটিল ও দুর্দান্ত নিরাপত্তা কৌশল হাতে নেয় তারা। দুঃসময়ে প্রমাণ হচ্ছে, ইমাম খোমেনির সিদ্ধান্তটি কতটা দূরদর্শী ছিল। ইরাকেরও তো বিরাট সেনাবাহিনী ছিল, কিন্তু তার পরিণাম আমরা জানি।জেনারেলদের কেনা যায়, হত্যা করা যায়; কিন্তু খোমেনিয় জটিল নিরাপত্তা ছক ব্যক্তিনির্ভর না, প্রতিষ্ঠান নির্ভর। আর যে প্রতিষ্ঠানগুলির রযেছে আদর্শিক পরিগঠন ও প্রশিক্ষণ। একই কথা ইরানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলির বেলাতেও খাটে। এদের আগাও যা মাথাও তা। আগা কাটলে মাথা জাগে, মাথা কাটলে নতুন আগা গজিয়ে ওঠে। কেবল মিলিটারির ওপর নির্ভর করলে ইরানের পরিণতি ভেনেজুয়েলার মত হতো, বা হতো পাকিস্তানের সিংহ ইমরান খানের মতো।
২.
যুদ্ধ কখনো একা সেনাবাহিনী করে না। যুদ্ধশক্তির শেকড় পোঁতা থাকে সমাজের গভীরে। পুরো সমাজ যখন যুদ্ধের নৈতিক শক্তি ও রসদ জোগান দেয়, তখন সেনাশক্তিকে হারানো কঠিন হয়। ইরানও প্রমাণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও প্রমাণ।
ভোগবাদী এপস্টেইন ক্লাস আর কোনো যুদ্ধে জিততে পারবে না। হয়তো আগ্রাসন চালাতে পারবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজিবাদী দুনিয়া আদর্শিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি কমিউনিস্ট রাশিয়ার মতাদর্শিক জেদ না থাকলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের পরিণতি কী হতো বলা যায় না।
আমেরিকার বেলায় যা সত্য, ভোগবাদী সুন্নী মুসলমানদের বেলাতেও তা সত্য। বহু আগেই তারা সাম্রাজ্যবাদী এপস্টেইন ক্লাসের বশ্যতা মেনে নিয়েছে। তাই তারা আর তাদের ভূমি ও ইজ্জত বাঁচাতে পারছে না। যুদ্ধ কেবল টাকা ও প্রযুক্তির খেলা না। এটা মনোবল ও পরিষ্কার উদ্দেশ্যের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মামলা।
এই মামলাই হাজির হয়েছিল কারবালার ময়দানে। একদিকে সত্য ও ন্যায়ের ইমাম, অন্যদিকে রাজতন্ত্রী উমাইয়াদের ক্ষমতার প্রতাপ | যারা সত্য ও ন্যায়ের পথ বেছে নিয়েছিল তারাই শিয়া, যারা সেনাপত্য ক্ষমতার বশ্যতা মেনে নিয়েছিল তারাই আজকের শাদ্দাদ। সেই শাদ্দাদের বেহেশতেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে শিয়া ইরান।
এই শিয়ারা জিডিপি, গিনি ইনডেক্স, মাথাপিছু আয় দিয়ে সাফল্য মাপে না। ফলে অর্থনৈতিক অবরোধে তারা নত হয়নি। তারা ৪৭ বছর ধরে সামরিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের মধ্যে আছে। ইরানের ভেতরে মোসাদ সিআইএ-র অজস্র অনুচর। তারা কখনো স্যাবোট্যাজ করে, কখনো নারী স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। ভেতরে-বাহিরে এ ধরনের অবরুদ্ধ রাষ্ট্র তার নাগরিকদের যতটা দেওয়া সম্ভব ততটা রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা দিতে পারে না। এক অন্তহীন জরুরী অবস্থা চলমান থাকায় উদারনীতি তাদের জন্য আত্মঘাতী বিলাসিতা। হয়তো হুমকি না থাকলে ইরানের সমাজ অন্যরকম হতো। যে ইরানে বিশ্বের যে কোনো দেশের চাইতে বেশি উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছে, অগ্রসর বিজ্ঞানী ও দার্শনিক শ্রেণী আছে, সেই ইরান হিজাব নিয়ে বাড়াবাড়ি করতো না, যদি নারীবাদের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী বোমা না থাকতো। আফগান নারীদের মুক্তির কথা বলে সেখানে পশ্চিমা নারীবাদ আগ্রাসন ও গণহত্যায় সামিল হয়েছিল, এটা আমরা যেন না ভুলি।
ইরান একটা জাতি। জোড়াতালির আরব বাদশাহী না। না বলেই আক্রমণ এলেই ভেদাভেদ ভুলে এক হয়। কারণ তারা জানে, হাজার বছর ধরে তাদের লড়তে হয়েছে, কারণ তারা জানে এই মাটি এই ভাষা আর এই সভ্যতার নির্মাতা ও মালিক তারা নিজেরাই। আমেরিকা বলছে ইরানকে প্রস্তরযুগে ফেরত পাঠাবে। ইরানের জবাবে রসিকতা ছিল: ‘আমরা যখন পৃথিবীর আদি আইন রচনা করছিলাম তোমরা তখন গুহাবাসী ছিলে!’
যাহোক, ইরান জিতছে কারণ তারা কারবালার অপশন বেছে নিয়েছে। এই শহীদানের রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তাদের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। তাঁর হত্যায় শুধু সামরিক ময়দানে না, সামাজিক ময়দানেও ঢেউ জেগেছে। পাকিস্তান থেকে কাশ্মীর, আফগান থেকে আজারবাইজান, ইরাক থেকে বাহরাইনসহ সারা বিশ্বের শিয়া জনতার মধ্যে যে বিদ্রোহী বিদ্যুত সংযোগ হয়ে গেল, এর ধাক্কা চলবে আগামী কয়েক দশক।মুসলমান হওয়ার মানে কী, তা জানবে সুন্নীরাও।
এখান থেকে জন্ম নিচ্ছে এক প্রতিরোধ, ইসলাম এখান থেকে পুনর্জীবিত হচ্ছে তার শহীদি জালেমবিরোধী সংগ্রামে। এর ঢেউ সমগ্র মুসলিম জগতকে কাঁদাচ্ছে, আলোড়িত করছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ থেকে প্রেরণা নেবে।
ইরান রাজাকে ভয় পায় না, সত্যকে বেছে নেয় সেই কারবালার মতো করেই। তার ফলে মধ্যপ্রাচ্য বদলে যাবে। তিনটি ঘটনা ঘটবে:
১. আমেরিকা এ অঞ্চলে আর সামরিক কর্তাগিরি করতে পারবে না
২. ইরান, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন, কাতার, কুয়েত, ওমান মিলে প্রতিরোধ বলয় জোরদার হবে। এই বলয় চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক আগের চাইতে সমতা ও সম্ভাবনায় নিয়ে যাবে
৩. অন্যদিকে সৌদি-ইসরায়েলের নেতৃত্বে বাহরাইন ও আরব আমীরাতকে নিয়ে শয়তানি বলয় হবে । জর্ডান ও সিরিয়া ও বাহরাইনে আরব বসন্তের মতো গণঅভ্যুত্থান বা বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। এসব দেশে শিয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। বাহরাইনে তো শিয়ার প্রায় ৫০%।
এই ঘটনার চতুর্থ মাত্রা আরো মজাদার । বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলারের সমরমেশিন অকেজো হয়ে যাবে সেই ম্যাট্রিক্স ফিল্মের মতো। ধবংসাত্মক অস্ত্রের জায়গায় ইরান খুলে দিল প্রতিরোধের অস্ত্রের সস্তা প্রযুক্তি। এটা বহু স্বাধীনতাকামী জাতিকে পথ দেখাবে ধস নামাবে যুদ্ধব্যবসায়। হাজরাইল গাজা ল্যাবরেটরি থেকে নৃশংসতার যুদ্ধাস্ত্র পয়দা করেছিল, ইরানের ল্যাবরেটরি জন্ম দিয়েছে প্রতিরোধের নতুন এক সমরবিজ্ঞানের।
ইরান শুধু দুর্ধর্ষই নয়, চমত্কারও বটে। কয়েকশ বছরের মধ্যে এমন গরীয়ান লড়াই কোনো মুসলিম দেশ লড়েছে কিনা সন্দেহ। হাজরায়েল কোনো জাতিরাষ্ট্র নয়, এটা একটা যুদ্ধমেশিন। কিন্তু ইরান একটা সভ্যতাবাদী রাষ্ট্র। যুদ্ধ চাপিয়ে সভ্যতা ধ্বংস করা যায় না।