০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫১

হরমুজ প্রণালি খুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ ৪০ দেশের জোট, যুক্ত হলো যেসব যারা

এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে হরমুজ প্রণালি   © সংগৃহীত

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে একজোট হয়েছে ৪০টি দেশ। 

হরমুজ খোলার বিকল্প উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে এই দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল সম্মেলনে বসিয়েছে যুক্তরাজ্য। এই সম্মেলনে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, জাপান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য আরও দেশ অংশ নেয়।

যৌথ এক বিবৃতি সই করে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য দাবি করেছেন এবং এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখার অঙ্গীকার করেছে। 

 আল-জাজিরার সাংবাদিক রোরি চ্যাল্যান্ডস জানান, এই জোটটি বেশ বড়। এটি কেবল পশ্চিমা দেশ বা নেটো সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ও বাল্টিক দেশগুলোর পাশাপাশি বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পানামা ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোও যুক্ত রয়েছে। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, দিনশেষে এই দেশগুলোর নৌ-সক্ষমতা কতটুকু এবং তারা আসলে কী করতে পারে।

বৃহস্পতিবারের সম্মেলনের সভাপতিত্বকালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, জলপথটি অবরুদ্ধ করে রাখার ইরানের ‘বেপরোয়া আচরণ’ আমাদের ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।’ 

সম্মেলনের শুরুতে গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে কুপার বলেন, ‘আমরা দেখছি ইরান একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে রেখেছে।’ তার এই প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর বৈঠকের বাকি অংশ রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলা এবং আরও হামলার হুমকির ফলে পারস্য উপসাগরকে বিশ্ব মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী এই প্রণালিতে প্রায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের প্রবাহের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধ হওয়ায় পেট্রোলিয়ামের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।

এই সম্মেলনে ৪০টি দেশ অংশ নিলেও যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ছিল না। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর তার দেশের কাজ নয়। ট্রাম্প একই সঙ্গে এই যুদ্ধে সমর্থন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করেছেন এবং নেটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই জোট গঠনের একটি উদ্দেশ্য হল, ট্রাম্প প্রশাসনকে দেখানো যে, ইউরোপ নিজের নিরাপত্তার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নেটো জোট ত্যাগের হুমকি দিচ্ছেন।

চলমান যুদ্ধের মধ্যে শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পক্ষে কোনও দেশকেই আগ্রহী না। কারণ, ইরান জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, অ্যাটাক ক্রাফট এবং মাইনের সাহায্যে যে কোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা রাখে। 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সমস্যার সামরিক সমাধানের ঘোর বিরোধী। কিয়ার স্টারমার এই যুদ্ধে জড়াতে একদমই আগ্রহী নন। এমনকি সম্মেলনে সমবেত হওয়া অধিকাংশ দেশেরই যুদ্ধে জড়ানোর কোনও ইচ্ছা নেই।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ বৃহস্পতিবার বলেন, শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালিটি খুলে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, ‘এটি কখনোই আমাদের সমর্থিত বিকল্প ছিল না কারণ এটি অবাস্তব। এতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে এবং জলপথ অতিক্রমকারীদের উপকূলীয় হুমকির মুখে ফেলবে, বিশেষ করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর কাছ থেকে, যাদের হাতে প্রচুর সম্পদ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।’ 

মাক্রোঁ পরামর্শ দেন যে, প্রণালিটি খুলে দেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা।

এই সম্মেলনকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার ধারাবাহিকতায় বিস্তারিত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘ওয়ার্কিং-লেভেল’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলন শেষে জানা গেছে, ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা আগামী সপ্তাহে এই দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেই পুনরায় বসবেন। তখন যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নৌ চলাচলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে। বুধবার স্টারমার বলেছিলেন, জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা ‘সহজ হবে না।’ এর জন্য সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক তৎপরতার একটি ‘যৌথ ফ্রন্ট’ এবং নৌ-শিল্পের সঙ্গে অংশীদারিত্বের প্রয়োজন হবে।

শিপিং ডেটা ফার্ম ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ২৩টি সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে ১১ জন ক্রু নিহত হয়েছেন।

ইরান অবশ্য দাবি করেছে যে, ‘শত্রুভাবাপন্ন নয়’ এমন জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। এই নৌপথটি কেবল শত্রু দেশ এবং তাদের মিত্রদের জাহাজের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।