ইরানে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সৈন্য বৃদ্ধির ‘গ্যাড়াকলে’ পাকিস্তানের শান্তি প্রচেষ্টা
ইরানের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলের বিমান হামলা জোরদার এবং পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অঞ্চলটিতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তানের শান্তি প্রচেষ্টাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং আপেক্ষিক নিরপেক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য এক জটিল ও সংবেদনশীল কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সরাসরি অংশীদার না হওয়া কিংবা কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি না থাকার কারণে অন্য সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীদের তুলনায় পাকিস্তান অনেকটাই চাপমুক্ত। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এই শান্তি প্রচেষ্টাকে আরো জটিল করে তুলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুসম্পর্ক রয়েছে এবং গেল কয়েক বছরে তেহরানের সাথেও ইসলামাবাদের সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি ঘটেছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, উভয় পক্ষই নীতিগতভাবে আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কিন্তু ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকা সংঘাত, আস্থার চরম সংকট এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে আলোচনা ফলপ্রসূ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইসরায়েল।
গত শুক্রবার ইসরায়েল ইরানের দুটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানা এবং বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এই হামলা কূটনীতিকে সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বেসামরিক অবকাঠামোতে আক্রমণ বন্ধ রাখার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার সম্পূর্ণ বিরোধী। এছাড়াও দুটি বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলা হয়েছে বলে ইরান জানিয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, এ ধরনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শান্তি আলোচনাকে ‘লাইনচ্যুত’ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, ‘ইরানের মূল উদ্বেগ হলো যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে যাতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আর কোনো হামলা না চালায় তা নিশ্চিত করা।’ ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ট্রাম্পের কথায় বিশ্বাস রাখা।’
ইরান শুধু একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার গ্যারান্টি চায়। একটি সম্ভাবনা হতে পারে যে যুদ্ধের সময় ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি তারা নিজেদের দখলেই রেখে দেবে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই ধারণাটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। যদিও ট্রাম্প নিজেই হরমুজ প্রণালিতে যৌথ মার্কিন-ইরানি প্রশাসনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শনিবার আরও জোরদার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ফোন করেছেন এবং আজ থেকে শুরু হওয়া সম্মেলনে তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নিচ্ছেন। এই চার দেশ মুসলিম বিশ্বে একটি নতুন মেরূকরণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যাদের রয়েছে বিশাল সেনাবাহিনী, পারমাণবিক অস্ত্র এবং সৌদি আরবের ‘আর্থিক শক্তি’। যদিও ইরানের হামলার শিকার হওয়া সৌদি আরবের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে এই বোমাবর্ষণ ‘অব্যাহত রাখার’ পক্ষে মত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইসলামাবাদ ধারণা করছে যে আলোচনাটি হবে পরোক্ষ। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে থাকা মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে মধ্যস্থতা করবেন, কারণ তেহরান সরাসরি মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আস্থার পরিবেশ তৈরির জন্য পাকিস্তান প্রস্তাব করেছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব যেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স করেন। ইরান এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছে কারণ তেহরান এর আগের আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে বিশ্বাস করে না।
পাকিস্তানের জন্য এই শান্তি প্রচেষ্টার পেছনে একটি বড় তাগিদও রয়েছে। গত বছর দেশটির সাথে সৌদি আরবের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায় রিয়াদ আক্রান্ত হলে পাকিস্তান তাদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হতে পারে। ইরানের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পাকিস্তান যেকোনো মূল্যে এই যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।