ইরানে হামলা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে সৌদি
ইরানের ওপর হামলা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাগাদা দিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির একটি গোয়েন্দা সূত্র এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে তেহরানের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে সরাসরি যোগ দেবে কি না, সে বিষয়েও সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে রিয়াদ। খবর গার্ডিয়ানের
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে ওই সূত্র জানায়, সৌদি আরবের ‘প্রভাবশালী’ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মাঝপথে থামিয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের মতে, মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সাজাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ অভিযান একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’।
সৌদি গোয়েন্দা সূত্রটি আরও জানায়, রিয়াদ কেবল এই সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখাই নয়, বরং এর তীব্রতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। যুবরাজের এই ভূমিকার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, সে একজন যোদ্ধা। সে আমাদের সঙ্গেই লড়ছে।’
অবশ্য প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের সরাসরি কোনো সামরিক অংশগ্রহণের খবর পাওয়া যায়নি। তবে সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলহামেদ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের নেতৃত্বে চলমান শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
আলহামেদ আরো বলেন, ‘এখন সবকিছু নির্ভর করছে ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর। ইরান যদি গুরুত্বের সাথে আলোচনায় অংশ নেয়, তবে উত্তেজনা প্রশমনের পথ এখনো খোলা আছে। কিন্তু তারা যদি শর্ত প্রত্যাখ্যান করে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে সৌদি আরব চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।’
তিনি দাবি করেন, সৌদি আরব হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। দেশটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা মোকাবিলা করা যায়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবুতে একটি তেল শোধনাগারে ইরানের ড্রোন আঘাত হানে।
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরের পাইপলাইন ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করার সক্ষমতা থাকায় পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের মুখে সৌদি আরব তার প্রতিবেশীদের তুলনায় কম ঝুঁকিতে ছিল। তবে ইয়ানবুতে হামলার মাধ্যমে ইরান একটি কড়া বার্তা দিয়েছে যে, সৌদির এই অর্থনৈতিক লাইফলাইনও এখন তাদের হুমকির মুখে। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা যদি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সৌদি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ হিশাম আলঘান্নাম বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে সৌদি আরব এখনো সতর্ক নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবের সম্পদে আঘাত হানে, তবে রিয়াদ রক্ষণাত্মক জোটে সমর্থন দিতে পারে অথবা সীমিত আকারে পাল্টা হামলা শুরু করতে পারে।’
সুন্নি ও শিয়া মতাদর্শের ধারক হিসেবে সৌদি আরব ও ইরান দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এর আগে ২০০৮ সালে এক ফাঁস হওয়া মার্কিন নথিতে দেখা গিয়েছিল, তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ তেহরানের শাসন ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সাপের মাথা কেটে ফেলার’ পরামর্শ দিয়েছিলেন।
নির্বাসিত সৌদি বিশ্লেষক খালিদ আলজাবরি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াদ চেয়েছিল আলোচনার মাধ্যমে ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সমাধান হোক। কিন্তু সেই আলোচনার মাঝপথেই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এই হামলা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘এখন যেহেতু যুদ্ধ শুরু হয়েই গেছে, তাই একটি আহত ইরান আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এখন সৌদির নীতি হলো— যুদ্ধ যেহেতু শুরুই করেছ, তবে তার শেষ দেখে ছাড়ো।’