মধ্যপ্রাচ্যে আরও তিন-চার হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আরও তিন থেকে চার হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ‘৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের’ কয়েক হাজার সদস্যকে শিগগিরই এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হতে পারে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কর্মকর্তারা জানান, মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নানা ধরনের বক্তব্য দিলেও একই সময় ওই অঞ্চলে সমরশক্তি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
এর আগে গত ১৮ মার্চের এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে আরও কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ইরানের ভেতরেও সেনা মোতায়েনের বিকল্প আরও জোরালো হবে এবং চার সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ যুদ্ধ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা ওই দুই কর্মকর্তা জানান, নতুন করে যে সেনাদের পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে, তাদের মধ্যপ্রাচ্যের ঠিক কোন দেশে মোতায়েন করা হবে এবং কবে তারা সেখানে পৌঁছাবে—সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ওই সেনারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে জানতে চাইলে তারা হোয়াইট হাউসের দিকে ইঙ্গিত করে। হোয়াইট হাউস জানায়, সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত সব ধরনের ঘোষণা পেন্টাগন থেকেই দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, “আমরা আগেও বলেছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের সামরিক বিকল্প রয়েছে।”
তবে ইরানের ভেতরে সরাসরি সেনা পাঠানোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। তবে নতুন করে পাঠানো সেনারা ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্রগুলোর একটি জানায়, পেন্টাগন তিন থেকে চার হাজার সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
এর আগে গত ২০ মার্চ রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, উভচর আক্রমণকারী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস বক্সার, তার সঙ্গে থাকা মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এবং যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার মেরিন ও নাবিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন সেনারা পাঠানোর আগেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
নতুন করে আরও তিন থেকে চার হাজার সেনা পাঠানোর এ পরিকল্পনার খবর প্রকাশের একদিন আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার কথা উল্লেখ করে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলার হুমকি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলেন। তবে সোমবার ট্রুথ সোশালে ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পর ইরান কোনো ধরনের আলোচনা হওয়ার খবর অস্বীকার করে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানের ভেতরে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২৯০ জন। আহতদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা গুরুতর, আর ২৫৫ জন সেনা ইতোমধ্যে আবার দায়িত্বে ফিরে গেছেন।
চার সপ্তাহ ধরে চলা এ হামলায় ইরানের ভেতরে অসংখ্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় দুই হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেওয়াসহ বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখছে বলে আগেই একাধিক মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছিল। এমনকি ইরানের উপকূলে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ যেখান দিয়ে হয়, সেই খার্ক দ্বীপে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে আগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন আদেশ পাওয়ার ১৮ ঘণ্টার মধ্যেই মোতায়েন করা সম্ভব এবং তারা প্যারাস্যুটের মাধ্যমে আক্রমণ পরিচালনায় বিশেষভাবে দক্ষ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে সীমিত পরিমাণ হলেও স্থলবাহিনী পাঠানো হলে তা ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ ইরানে মার্কিন হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ব্যাপক সমালোচনা চলছে এবং বেশিরভাগ জরিপেই দেখা যাচ্ছে, মার্কিন নাগরিকদের বড় অংশই এই যুদ্ধ সমর্থন করছেন না।
মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ইরানে মার্কিন হামলার পক্ষে রয়েছেন মাত্র ৩৫ শতাংশ নাগরিক, যেখানে গত সপ্তাহে এ হার ছিল ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে ৬১ শতাংশ নাগরিক হামলার বিরোধিতা করছেন, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় দুই শতাংশ বেশি।