ফিলিপাইনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কায় ফিলিপাইনে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। খবর সিএনএন।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র এক নির্বাহী আদেশে এই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহের প্রাপ্যতা ও স্থিতিশীলতা বর্তমানে ‘আসন্ন বিপদের’ মুখে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে এবং তেলের সরবরাহ ও দাম—দুটিই বড়ভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, আগামী এক বছরের জন্য এই জরুরি অবস্থা কার্যকর থাকবে, যদি না প্রেসিডেন্ট নিজে এটি প্রত্যাহার বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকার জ্বালানি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি রক্ষায় প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আইনগত ক্ষমতা পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ফিলিপাইন তাদের প্রায় ৯৮ শতাংশ জ্বালানি তেল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ছোট ভাইকে গুলি করে হত্যা, সাবেক এমপি প্রার্থী আটক
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়র একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটি জ্বালানি তেল, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও সুষ্ঠু বণ্টন তদারকি করবে। একই সঙ্গে সরকার সরাসরি জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনে মজুত করার ক্ষমতাও পেয়েছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, পরিবহন খরচ কমাতে জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া, তেল মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়গুলোও এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালক ও পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ৫ হাজার পেসো (প্রায় ৮৩ ডলার) করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মার্কোস। কৃষক, জেলে এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের জন্যও বিশেষ কল্যাণমূলক কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
একই সময়ে দেশটির জ্বালানি সচিব শারন গ্যারিন জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বেড়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশটিতে রাজনৈতিক ও শ্রমিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রধান শ্রমিক জোট কিলুসাং মায়ো উনো (কেএমইউ) জরুরি অবস্থা ঘোষণাকে সরকারের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি বলে মন্তব্য করেছে। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, সরকার আগে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে দাবি করলেও এখন হঠাৎ করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
কেএমইউ আরও অভিযোগ করেছে, নির্বাহী আদেশে এমন কিছু ধারা রয়েছে যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে—এই যুক্তিতে শ্রমিকদের আন্দোলন বা ধর্মঘট সীমিত করা হতে পারে। এর ফলে শ্রমিকদের প্রতিবাদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে বড় শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান ম্যানুয়েল ভি. পাঙ্গিলিনান সরকারের এই জরুরি ক্ষমতাকে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে ব্যবসা কার্যক্রমেও পড়তে শুরু করেছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের বিকল্প খোলা রাখা উচিত।
এদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে পরিবহন শ্রমিক সংগঠন পিস্টন পরিবহন জোট বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিনের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের দাবি, জ্বালানি কর বাতিল, তেলের দাম কমানো, ভাড়া বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই সরকার পরিবহন চালকদের জন্য ভর্তুকি দেওয়া, ফেরি সার্ভিস কমানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি কর্মচারীদের চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।