২৪ মার্চ ২০২৬, ১৮:০২

ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় পাকিস্তান কি মধ্যস্থতা করছে?

ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় পাকিস্তান কি মধ্যস্থতা করছে?  © সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ইরান যদি শর্ত না মানে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘নিশ্চহ্ন’ করে দেবে। পাকিস্তান সময় গত রবিবার ভোর পৌনে পাঁচটায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ওই হুমকি দিয়েছিলেন।

কিন্তু সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি থাকতে সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, তিনি ইরানের ওপর সব ধরনের হামলা স্থগিত করছেন। তিনি বলেন, উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘খুবই ইতিবাচক, ফলপ্রসূ এবং গঠনমূলক আলোচনা’ হয়েছে। তবে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের বক্তব্যকে জ্বালানির দাম কমানোর এবং তাদের সামরিক পরিকল্পনার জন্য কালক্ষেপণ করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন যে, আর্থিক ও তেলের বাজারকে ‘প্রভাবিত’ করার জন্য ‘ভুয়া খবর’ ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে, একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা বিবিসির মার্কিন পার্টনার সিবিএস নিউজকে বলেছেন, আমরা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু প্রস্তাব বা পয়েন্টস পেয়েছি, এবং সেগুলো বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি অস্বীকার করা সত্ত্বেও, এখন কেবল আলোচনার কথাই শোনা যাচ্ছে না, বরং এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে ইরানের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং এমনকি দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাবও দিয়েছে।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নাম
ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এবং আমেরিকান ডিজিটাল নিউজ ওয়েবসাইট অ্যাক্সিওসের রিপোর্টের বরাত দিয়ে হোয়াইট হাউস থেকে বিবিসির সংবাদদাতা বার্ন্ড ডেবসম্যান জুনিয়র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে হামলার পর উদ্ভূত সংঘাত নিরসনে সম্ভাব্য আলোচনায় পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

ওয়াশিংটনে বিবিসির সংবাদদাতা ড্যানিয়েল বুশও লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ আলোচনা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাঙ্ক গার্ডনারও বিভিন্ন রিপোর্টের সূত্র ধরে পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করেছেন।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, পক্ষগুলোর মধ্যে গত রবিবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে আলোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ফ্রাঙ্ক গার্ডনার বলছেন, আরেকটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট অনুযায়ী— মিশর, তুরস্ক এবং পাকিস্তান এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত ছিল।

এদিকে, পাকিস্তানি পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির হুসাইন আন্দ্রাবি বিবিসির ক্যারি ডেভিসকে বলেছেন, পক্ষগুলো চাইলে ইসলামাবাদ সর্বদা আলোচনা আয়োজন করতে প্রস্তুত। পাকিস্তান এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ধারাবাহিকভাবে সংলাপ ও কূটনীতিকে সমর্থন করে আসছে। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র এও জানিয়েছেন যে, তারা কোনো পক্ষের সাথেই আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনটিই করবেন না।

অপরদিকে মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে ১৫টি পয়েন্ট সম্বলিত তাদের প্রত্যাশার একটি তালিকা পাঠিয়েছে। যদিও ইরান এসব প্রস্তাবের কোনোটিতে রাজি হয়েছে কী—না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সিএনএন আরও দাবি করেছে, পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মালিক সেইসব কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম যারা উইটকফ এবং কুশনারের সাথে যোগাযোগ রাখছেন।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের পক্ষ থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি, তবে পাকিস্তানের এ ভূমিকা ওয়াশিংটনের অনেকের কাছেই আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় নয়।

গত বছর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ডমার্শাল আসিম মুনিরের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের সাথেও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির গত বছরের জুন ও সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেপ্টেম্বর সফরের সময় আসিম মুনিরের সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ছিলেন। ভারত-পাকিস্তান বিরোধের সময় মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার জন্য জুন এবং অক্টোবর মাসে পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল। এ পদক্ষেপের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক সদস্যের দৃষ্টিতে আসিম মুনিরের প্রতি সহানুভূতি বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের আবির্ভূত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি বলেন, গত এক বছরে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে এবং 'মার্কিন প্রশাসনও পাকিস্তানকে পছন্দ করে।

মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ট্রাম্প বলেছেন, আসিম মুনীর ইরানকে বেশিরভাগ মানুষের চেয়ে ভাল বোঝেন। এটাও উল্লেখযোগ্য যে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের কূটনৈতিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।

পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক শামশাদ আহমেদ বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানকে যদি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দেওয়া হয়, তবে তার কারণ হতে পারে পাকিস্তান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল। বিবিসি প্রতিনিধি উমাইর মাহমুদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, যদি এটি ঘটে (অর্থাৎ যদি পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে), তবে সেটি দেশটির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালনের একটি ভাল সুযোগ হবে। তবে শামশাদ আহমেদের মতে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো আগাম ধারণা করা সম্ভব নয়।

কিন্তু পাকিস্তান যদি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে, তবে ইরানের কাছে সেটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? এ প্রশ্নের জবাবে শামশাদ আহমেদ বলেন, ইরানিরা যেকোনো আরব দেশের তুলনায় পাকিস্তানের ওপর বেশি আস্থা রাখবে।

উল্লেখ্য, ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নওরোজ উৎসব উপলক্ষে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, পাকিস্তান তার পিতা আলী খামেনির একটি ‘বিশেষ প্রিয়’ দেশ ছিল।

রাজনীতিবিদ এবং সাবেক মানবাধিকার মন্ত্রী শিরিন মাজারি এ আলোচনায় পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে ইসরায়েল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে— সেটি নিয়ে তার মনে সংশয় ও উদ্বেগ রয়েছে। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ইসরায়েলের মত একটি লাগামহীন দেশের আচরণের গ্যারান্টি কে দেবে? আর ট্রাম্প যে একটি শান্তি চুক্তিতে অটল থাকবেন, সে নিশ্চয়তা-ই বা কে দিতে পারে?

ইরান ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পরস্পরবিরোধী খবর এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে খবর প্রকাশের মাঝেই, পাকিস্তান ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করেছেন। এ যোগাযোগের পর জারি করা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ‘আলোচনা ও কূটনীতি’ শব্দগুলো বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে টেলিফোনে কথা বলেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান

তিনি তার এক্স পোস্টে লিখেছেন, একটি প্রতিবেশী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে, আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সাহসী ইরানি জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছি। যুদ্ধে ঘটা প্রাণহানির জন্য আমি আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।

বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ইরানি প্রেসিডেন্টের সাথে তার কথোপকথনে ‘উত্তেজনা হ্রাস, আলোচনা এবং কূটনীতি বজায় রাখার বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়েছে।’ শাহবাজ শরিফ তার পোস্টে উল্লেখ করেন, আঞ্চলিক শান্তির জন্য পাকিস্তান তার গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে যাবে।

এরপর উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই নেতা সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং মোহাম্মদ ইসহাক দার ‘শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।’