২৪ মার্চ ২০২৬, ১৬:৪৬

ধ্বংসস্তূপের মাঝে যেভাবে কাটলো গাজার ঈদ

যুদ্ধে নিহতদের কবর জেয়ারত করছেন পরিবারের সদস্যরা  © সংগৃহীত

ঈদুল ফিতর মানেই এক মাসের সংযম শেষে মুক্তির আনন্দ। গাজায় এই দিনটি বরাবরই ছিল উৎসবের, প্রার্থনার এবং আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করার। কিন্তু এবারের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষের মুখে ‘ঈদ মোবারক’ শব্দগুলো যেন এক বিশাল শূন্যতার হাহাকার হয়ে ধরা দিচ্ছিল। আচার-অনুষ্ঠানগুলো টিকে থাকলেও, ঈদের চিরাচরিত সেই আনন্দটুকু হারিয়ে গেছে বোমার আঘাতে। বাড়িঘর থেকে ফুলের বাগান পর্যন্ত ধ্বংস আর শোকের অতল গহ্বর যেন পরিণত হয়েছে এই উপত্যকার মানুষের নিয়তিতে।

খালি ঘরে কান্নার প্রতিধ্বনি

গাজার প্রতিটি ঘরে এখন উৎসবের বদলে শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে ভিড় জমানোর সেই চিরচেনা প্রথা এবার পালিত হয়েছে নিহতদের স্মরণে। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ স্বামী, কেউবা পরিবারের সব সদস্যকে। একজনের বোন গাদার ঘর আজ নিশ্চিহ্ন, তিনি এখন সন্তানদের নিয়ে একটি গ্যারেজ ভাড়া করে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। আরেক আত্মীয়া ওম মাহমুদের অর্ধেক ভেঙে পড়া বাড়িতে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা; এক রাতেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি হারিয়েছেন স্বামী, সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের।

হারানো স্বজনদের দীর্ঘ তালিকা

গাজা শহরের প্রতিটি অলিগলি যেন এখন স্বজন হারানোর এক একটি মহাকাব্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি বিভাগের পরিচালক হানি, যিনি একটি ক্লিনিকে কর্মরত অবস্থায় নিহত হয়েছেন, তার স্ত্রী নবিলাও হারিয়েছেন দুই ছেলেকে। প্রতিটি পরিবারে কেউ না কেউ নেই—কোনো বাড়িতে বিধবা পুত্রবধূ, কোথাও পিতৃহীন শিশু, আবার কোথাও পঙ্গু হয়ে যাওয়া কিশোর। এই ভয়াবহতা থেকে বাদ পড়েনি ছোট শিশুরা পর্যন্ত। বাবার অভাব বুঝতে না দিতে মায়েরা তাদের নতুন পোশাক পরিয়ে সাজিয়ে দিলেও, তাদের নিষ্পাপ মুখগুলোতে ছিল বাবার জন্য এক অব্যক্ত হাহাকার।

ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে ফেরা জীবন

পরিবারের মিলনায়তনটি যেন আজ পুরো গাজার প্রতিচ্ছবি। একদিকে বসে আছেন নিহত বাবার এতিম ছেলেরা, অন্যদিকে শোকাতুর ভাই সোবহি, যার মেয়ে ও জামাতা নিহত হয়েছেন। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা ১১ মাস বয়সি এক শিশু এখন তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। ঘরে আসা প্রতিটি মেহমান যেন এক একটি ট্র্যাজিক গল্পের সংকলন। কারও ঘাড়ের জখম নিয়ে পুনর্বাসনে থাকা সন্তান, আবার কারও পাঁচ ভাইকে হারানোর বেদনা—সব মিলে গাজার বাতাস এখন ভারাক্রান্ত।

 উৎসব যখন সাক্ষ্যদান

এবারের ঈদ গাজাবাসীর জন্য কোনো পুনর্মিলন ছিল না, বরং এটি ছিল এক দীর্ঘ শোকযাত্রা । মানুষ একে অপরের বাড়িতে গিয়েছে আনন্দের জন্য নয়, বরং শোকাতুর হৃদয়ে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে। ঈদের প্রতিটি অনুষঙ্গ—নামাজ, নাস্তা, কোলাকুলি কিংবা ছোটোদের সালামি—সবই ছিল, কিন্তু তার ভেতরের প্রাণটুকু কেড়ে নিয়েছে যুদ্ধ। গাজার এই প্রথম ঈদটি ছিল ভালোবাসা, আত্মীয়তা এবং ধ্বংসের মাঝে এক দীর্ঘ পথচলা, যা শেষ হয়েছে এক নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে।