০৯ মার্চ ২০২৬, ১২:১৪

কৌশলগত মজুদ তেল ছাড়ের বিষয়ে আলোচনায় বসছে জি৭

মজুদ তেল  © টিডিসি ফটো

উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের জেরে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে জরুরি ভিত্তিতে পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেল ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা করবে জি৭-ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা। সোমবার এই জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত জি৭ এর এক কর্মকর্তা জানিয়েছে, সোমবার নিউ ইয়র্ক সময় সকাল সাড়ে ৮টায় অর্থমন্ত্রীরা এবং আইইএ-র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল একটি টেলিফোন কনফারেন্সে যুক্ত হবেন। সেখানে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে সৃষ্ট সংকট নিয়ে আলোচনা করা হবে।

জানা গেছে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ জি৭-এর তিনটি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ-র ৩২টি সদস্য দেশ তেলের দাম নিয়ে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় একটি যৌথ জরুরি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কৌশলগত তেলের মজুদ বজায় রাখে। একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়া উপযুক্ত হবে, যা মোট মজুদের (১.২ বিলিয়ন ব্যারেল) ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।

এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দামের ব্যাপক বৃদ্ধি হ্রাসের জন্য চাপের মুখে রয়েছেন। রবিবার নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন ৩.৪৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ২.৯৮ ডলার। ট্রাম্প যদি এই ধারা পাল্টাতে না পারেন, তবে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত সপ্তাহে তেলের দাম বাড়ার ফলে বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এটি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জার্মানি, ইতালি এবং স্পেন অপরিশোধিত তেলের বড় আমদানিকারক হওয়ায় তেলের দামের এই আকস্মিক বৃদ্ধিতে দেশগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সোমবার এশিয়ার বাজারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২৪ শতাংশ লাফিয়ে ব্যারেল প্রতি ১১৬.৭১ ডলারে পৌঁছায়। তবে জি৭ বৈঠকের খবর আসার পর তা ১৯ শতাংশ কমে ১১০.৮৫ ডলারে নেমে আসে। একইভাবে মার্কিন বাজার অনুযায়ী ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ২৮ শতাংশ বেড়ে ১১৬.৪৫ ডলারে উঠেছিল, যা পরে ১৯ শতাংশ কমে ১০৮ ডলারে স্থির হয়।

১৯৭৪ সালে আরব দেশগুলোর তেল অবরোধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা মোকাবিলাতেই আইইএ এবং এই জরুরি পেট্রোলিয়াম মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এই মজুদের মূল লক্ষ্য হলো বড় তেল ব্যবহারকারী দেশগুলো যাতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে দ্রুত সাড়া দিতে পারে।

আইইএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত সদস্য দেশগুলো মোট পাঁচবার যৌথভাবে তেল মজুদ থেকে বাজারে ছেড়েছে। এর মধ্যে শেষ দুইবার করা হয়েছিল ২০২২ সালে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

গত মঙ্গলবার আইইএ একটি জরুরি বৈঠক করে তেলের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছে। ওই বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা একটি নথিতে বলা হয়েছে, তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইইএ 'পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত' রয়েছে। ওই গোপনীয় নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইইএ দেশগুলোর কাছে ১.২৪ বিলিয়ন ব্যারেল সরকারি মজুদ ছাড়াও আরও প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ব্যারেল শিল্প মজুদ রয়েছে, যা প্রয়োজনে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব।

নথি অনুযায়ী, এই মজুদ দিয়ে আইইএ দেশগুলোর প্রায় এক মাসের মোট তেলের চাহিদা অথবা ১৪০ দিনের নিট আমদানি মেটানো সম্ভব। মোট ১.২৪ বিলিয়ন ব্যারেল মজুদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কাছেই আছে ৭০০ মিলিয়ন ব্যারেল।

তেলের দামের এই বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি কমানো এবং জ্বালানি খরচ কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ইতিমধ্যে নিজ দল রিপাবলিকানের অনেক সদস্যই তাঁর সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প ঘরোয়া জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চেয়ে বিদেশের বিষয় নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করছেন।

তবে রবিবার সন্ধ্যায় নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। তিনি লিখেছেন, 'স্বল্পমেয়াদী তেলের দাম, যা ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হওয়ার পর দ্রুত কমে যাবে, তা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য খুবই নগণ্য একটি মূল্য। শুধুমাত্র বোকারাই ভিন্ন কিছু ভাববে!'

তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে সোমবার এশিয়ার বেশিরভাগ শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। ফিউচার ইনডেক্স অনুযায়ী, সোমবার মার্কিন শেয়ার বাজারও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে, যা আর্থিক বাজারের চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরনের পরিবর্তন বা ইউ-টার্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ গত সপ্তাহেই প্রশাসন জানিয়েছিল যে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে মজুদ থেকে তেল ছাড়ার প্রয়োজন হবে না। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, গত এক সপ্তাহে তেলের দাম যেভাবে রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে, তাতে নীতিনির্ধারকদের সামনে মজুদ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

গত শুক্রবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছিলেন যে, এই যুদ্ধ 'বিশ্বের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে' এবং তিনি ধারণা করছেন উপসাগরীয় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে।

রবিবার র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপ এক নোটে সতর্ক করে বলেছে যে, আইইএ সদস্যদের ওপর কৌশলগত মজুদ ছাড়ার জন্য 'প্রচণ্ড চাপ আসবে'।

এদিকে চীন, যারা আইইএ-র পূর্ণ সদস্য নয়, তারাও গত ১২ মাসে বিশাল তেলের মজুদ গড়ে তুলেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বেইজিংয়ের কাছে ১.১ থেকে ১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে তাদের দেশের প্রায় ১৪০ দিনের তেলের চাহিদা মেটানো সম্ভব।