০৪ মার্চ ২০২৬, ১০:৫১

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দিনে খরচ কত, কতদিন চালানোর সক্ষমতা আছে?

ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র  © ফাইল ফটো

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ বহু পুরোনো। গত শনিবার তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। হত্যা করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। এরপর ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাতে থাকলে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়। তবে যুদ্ধের ব্যয়, প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র ও পারিপাশ্বিক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্ন উঠেছে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র কতদিন চালিয়ে যেতে পারবে?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নিজের অ্যাকাউন্টে ৮ মিনিটের একটি ভিডিও পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প। ভিডিওতে তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের ভূখণ্ডে একটি ‘বড় যুদ্ধাভিযান’ শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী। পরে পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ পোস্ট দিয়ে জানায়, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের নাম রাখা হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ট্রাম্পের দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করাই এ সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র বি-১, বি-২ স্টিলথ, সর্বাধুনিক এফ-৩৫, এফ-১৫, এফ-১৬ ফ্যালকন ইত্যাদি ‍যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। এছাড়া লুকাস ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য এম ১৪২ হাই মবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স), সাগর থেকে নিক্ষেপযোগ্য টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।

এছাড়া মানববাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মোতায়েন করা হয়েছে। সমুদ্রপথে টহল-নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে পি-৮ পসেইডন টহল উড়োজাহাজ। যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের পণ্য ও রসদ পরিবহনে কাজে লাগানো হচ্ছে সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৮০ হারকিউলিসসহ বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ।

অত্যাধুনিক এসব সমরাস্ত্র ব্যবহার করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কোটি কোটি ডলার খরচ করে ফেলেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ হতে পারে, সেটা ঠিকঠাক অনুমান করা কঠিন। তবে তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার খরচ হয়েছে। এ ছাড়া অভিযানের আগে যুদ্ধবিমানের অবস্থান পরিবর্তন, ডজনের বেশি নৌযান মোতায়েন ও আঞ্চলিক সম্পদ একত্র করার মতো সামরিক প্রস্তুতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও প্রায় ৬৩ কোটি ডলার খরচ করেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায় ইসরায়েলকে সামরিক হামলা চালানোর জন্য সহায়তা দিতে গিয়ে মার্কিন করদাতাদের পকেট থেকে ৯৬৫ কোটি থেকে ১ হাজার ২০৭ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩ হাজার ১৩৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৩৭৭ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এটা ক্রমে বাড়ছেই।

কুয়েতে অন্তত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরানি যুদ্ধবিমান মনে করে ভুলবশত কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি মূল উদ্বেগ নয়, বরং সেখানে অস্ত্র আর সামরিক সরঞ্জামের মজুত কতটা আছে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে তা তাদের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট থাকায় শুধু অর্থের দিক থেকে যুদ্ধ টেকসই হতে পারে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো অস্ত্রের মজুত। বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট দেখা দিতে পারে। 

প্রিবল বলেন, বর্তমান হারে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কার্যক্রম দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ও এসএম-৬ ধরনের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত। এগুলোর একটি বড় অংশ ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্যও নির্ধারিত। ফলে এক ফ্রন্টে অতিরিক্ত ব্যবহার অন্য অঞ্চলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, প্যাট্রিয়ট ও এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির পণ্য। এগুলো দ্রুত, বড় সংখ্যায় উৎপাদন করা সম্ভব নয়।

এরপর গত সোমবার ট্রাম্প বলেছেন, যত দিন প্রয়োজন যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। তবে আবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।