বিপ্লবের পর চার দশক নেতৃত্বে থাকা কে এই আয়াতুল্লাহ খামেনি?
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ‘ফারস নিউজ এজেন্সি খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে দেওয়া এক ঘোষণায় উপস্থাপক দেশটিতে ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে তেহরানে নিজ দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় তিনি নিহত হন। সরকারি বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘কাপুরুষোচিত হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে জানায়, ‘ইসলামি বিপ্লবের নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যিদ আলী খামেনি শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে আমেরিকা ও জায়নিস্ট শাসনের যৌথ হামলায় শহীদ হয়েছেন।’
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, খামেনি ও অন্যান্য ইরানি কর্মকর্তারা ‘মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি ও উন্নত ট্র্যাকিং ব্যবস্থার’ বাইরে যেতে পারেননি।
বিপ্লব থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে
১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন খামেনি। সে বছরই ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনীর মৃত্যুর পর তিনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব পাহলভি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটালেও, পরবর্তী সময়ে সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা রাখেন খামেনি।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন তিনি। পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন এবং যুদ্ধকালীন বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। বিশেষজ্ঞ ওয়ালী নসর বলেন, খামেনির নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র সবসময় নিজেদের ‘হুমকির মুখে থাকা রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং জাতীয়তাবাদ, বিপ্লব ও ধর্মকে একসূত্রে গেঁথে দেখেছে।
শিক্ষা ও প্রারম্ভিক জীবন
১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শিয়া শহর মাশহাদ জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। তার পরিবার আগে তাবরিজে বসবাস করলেও পরে মাশহাদে স্থায়ী হয়। অল্প বয়সে কোরআন শিক্ষা দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। প্রথাগত উচ্চবিদ্যালয় শেষ না করে তিনি ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং নাজাফ ও কোমের উচ্চতর শিয়া শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যয়ন করেন। কোমে অবস্থানকালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ হন এবং শাহবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন।
১৯৫৩ সালে এমআই৬ ও সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শাহের শাসন সুদৃঢ় হয়। সে সময় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খামেনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন এবং নির্বাসিতও হন। ১৯৭৮ সালের গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পাহলভি শাসনের পতনে ভূমিকা রাখেন।
ক্ষমতায় উত্থান ও চ্যালেঞ্জ
১৯৮১ সালে বিরোধী সংগঠন মুজাহেদিন-ই-খালকের (এমইকে) হামলায় আহত হয়ে ডান হাত আংশিকভাবে অকার্যকর হয় তার। একই বছরে তিনি ইরানের প্রথম ধর্মীয় পটভূমির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে সংবিধান সংশোধনকারী পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করে, যদিও সে সময় তিনি প্রচলিত উচ্চতর ধর্মীয় উপাধি ধারণ করতেন না।
খামেনির শাসনামলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একটি শক্তিশালী সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তিনি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ নীতির মাধ্যমে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে স্বনির্ভরতা জোরদার করেন। ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির আলোচনার অনুমোদন দিয়ে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের চুক্তি করেন, যা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন নামে পরিচিত। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
বিক্ষোভ, দমন-পীড়ন ও আঞ্চলিক কৌশল
২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ বিক্ষোভ, ২০১৯ সালে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এসব ঘটনায় শতাধিক থেকে হাজারো মানুষ নিহত হন।
খামেনির পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়া-ইরাকভিত্তিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক। এই নীতির মূল স্থপতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি, যিনি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হন।
২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেল আবিবে। প্রায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি জড়িত হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু খামেনিকে হত্যার হুমকি দেন এবং ট্রাম্প ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘মেজর কমব্যাট অপারেশন’ শুরু করেছে এবং ইরানি জনগণকে শাসনব্যবস্থা দখলের আহ্বান জানান।
এই পরিস্থিতিতে শনিবার ভোরে তেহরানে তার দপ্তরে হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয় বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা খামেনির মৃত্যু দেশটির রাজনীতি, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।