০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩০

এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা

শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা   © সংগৃহীত

এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের শঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একের পর এক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। গত কয়েক মাসে ফিলিপাইন, তাইওয়ান, চীন ও জাপানে এসব ঝড়ের কারণে প্রাণহানি, বন্যা, ফসলের ক্ষতি এবং যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। এমনকি বন্ধ রাখতে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরও। 

আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, চলতি বছরের এল নিনো সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাব আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অক্টোবরে তাইওয়ানের দিকে ধেয়ে আসে সুপার টাইফুন চান্দি। ঘণ্টায় ২৯৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস নিয়ে এগিয়ে আসা ঝড়টি দ্বীপটির প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে আতঙ্কিত করে। শেষ পর্যন্ত ঝড়টি তাইওয়ানে সরাসরি আঘাত না হানলেও সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। ঝড়ের প্রভাবে হংকং, তাইওয়ান ও জাপানে শত শত ফ্লাইট বাতিল করতে হয়। ফিলিপাইনের বাতানেস দ্বীপপুঞ্জে সমুদ্রের বড় ঢেউয়ের কারণে উপকূলীয় সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে ১৫ হাজার বাড়ি।

এর আগে গত জুনে জাপানের দিকে একসঙ্গে এগিয়ে আসে দুটি ঘূর্ণিঝড়। ঝড়ের আশঙ্কায় প্রায় ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। জুলাইয়ে চীনের দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হন।

এ ছাড়া আগস্টে সুপার টাইফুন ডলফিন টানা ১৬ দিন প্রশান্ত মহাসাগরে তাণ্ডব চালানোর পর চীনের পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে। এর প্রভাবে সেখানে বন্যা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে ঘূর্ণিঝড়গুলো স্বাভাবিকের তুলনায় পূর্ব দিকে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে উষ্ণ পানির ওপর দীর্ঘ সময় অবস্থান করায় ঝড়গুলো আরও শক্তি সঞ্চয় করছে।

আবহাওয়াবিদদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের সম্মিলিত শক্তি গত ৩০ বছরের গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। ফলে এসব অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।

ফিলিপাইনের জলবায়ুবিদদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়লে ঘূর্ণিঝড়ের সময় বৃষ্টিপাত ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও নিচু এলাকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যে প্রস্তুতি জোরদার করেছে জাপান ও চীন। দেশ দুটি আগাম সতর্কতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো খাদ্য উৎপাদন, বিশেষ করে ধান চাষে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় কৃষকদের সহায়তা বাড়াচ্ছে।

তবে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) সতর্ক করে বলেছে, এল নিনোর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারগুলোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম পরিকল্পনা, সতর্কতাব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।

এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।